দোহা আলোচনার মাঝেই হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বিমান হামলা
 

 

দোহায় শান্তি আলোচনার মাঝেই হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বিমান হামলা; ভূপাতিত মার্কিন ড্রোন

একদিকে যখন মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কাতারের দোহায় আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘হরমোজ প্রণালি’র কাছে সিরিজ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এই আকস্মিক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের তীব্র অভিযোগ উঠেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে চরম যুদ্ধ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

আমেরিকার এই হামলাকে ‘সীমিত’ বলে বর্ণনা করা হলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই সংঘাতের ফলে যুদ্ধ অবসানের চলমান দোহা আলোচনা সম্পূর্ণ লাইনচ্যুত বা ভেস্তে যাওয়ার বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আত্মরক্ষা’র দাবি ও মাইন আতঙ্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের ওপর সম্ভাব্য হুমকি ও হামলা রুখতে তারা এই ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। সেন্টকমের মুখপাত্র নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, সোমবার শেষরাতের এই হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং পারস্য উপসাগরে মাইন স্থাপনের চেষ্টায় থাকা ইরানি স্পিডবোটগুলোকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

বর্তমানে ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জয়পুরে সাংবাদিকদের বলেন, হরমোজ প্রণালির কাছে ইরানের সামরিক বাহিনী মাইন স্থাপন করছে বলে ওয়াশিংটন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়েছে। উল্লেখ্য, এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। রুবিও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি সচল রাখতে যেভাবেই হোক হরমোজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতেই হবে। তবে ইরানের সাথে চুক্তি চূড়ান্ত হতে এখনও ‘কয়েক দিন সময় লাগতে পারে’ বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) কিছুটা মিশ্র বার্তা দিয়ে লিখেছেন, “ইরানের সাথে হোয়াইট হাউসের আলোচনা ভালোভাবেই চলছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে আরও বড় ও বিধ্বংসী হামলার মুখোমুখি হতে হবে তেহরানকে। হলে সবার জন্য একটি চমৎকার চুক্তি হবে, অন্যথায় কোনো চুক্তিই হবে না—আমাদের আবারও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যেতে হবে।”

ইরানের পাল্টা আঘাত: মার্কিন ‘রিপার ড্রোন’ ভূপাতিত করার দাবি:

মার্কিন বিমান হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান ওয়াশিংটন প্রকাশ না করলেও ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, হরমোজ প্রণালি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ ইরানের প্রধান নৌ-বন্দর ‘আব্বাস’ এলাকায় মুহুর্মুহু ব্যাপক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আল জাজিরার সূত্রমতে, এই মার্কিন হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও সদস্য নিহত হয়েছেন।

এর জবাবে মঙ্গলবার (২৬ মে ২০২৬) এক বিশেষ বিবৃতিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, ইরানি আকাশসীমায় শত্রুভাবাপন্ন মার্কিন যুদ্ধবিমানের অনুপ্রবেশ চিহ্নিত করার পরপরই তারা আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক ‘এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন’ (MQ-9 Reaper Drone) ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ভূপাতিত করেছে। এছাড়া একটি মার্কিন আরকিউ-৪ (RQ-4) নজরদারি ড্রোন এবং একটি এফ-৩৫ (F-35) স্টিলথ যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে তারা বিমান বিধ্বংসী গোলাবর্ষণ করেছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের আকাশসীমা ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত বা কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ‘বৈধ ও নিশ্চিত’ আন্তর্জাতিক অধিকার তেহরানের রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, কাতারের দোহায় আলোচনা চললেও চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর দাবি এখনই করা যাচ্ছে না। তিনি আবারও পরিষ্কার করেন যে, এই মুহূর্তে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না, তাদের মূল ও একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে মার্কিন নৌ-অবরোধ ও যুদ্ধ অবসান।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ও শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা:

গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দুই পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও স্থায়ী শান্তির কোনো রূপরেখা এখনও আসেনি। এরই মধ্যে কাতারের দোহায় পৌঁছেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেম্মতির নেতৃত্বাধীন এক শক্তিশালী প্রতিনিধিদল।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই শান্তি আলোচনার সাথে সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানকে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (Abraham Accords)-এ যুক্ত করার কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসরায়েলের সাথে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করা।

ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (CSIS)-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের ডিরেক্টর মোনা ইয়াকুবিয়ান এবং আল জাজিরার ওয়াশিংটন প্রতিনিধি অ্যালান ফিশার সতর্ক করেছেন যে, ইরান যেহেতু তাদের সেনা নিহতের ঘটনায় পাল্টা প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে, তাই দোহা চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগমুহূর্তে এই ফ্রন্টলাইন সংঘাত পুরো শান্তি প্রক্রিয়াকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top