অন্তর্বর্তী সরকারে কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল, আমি ছিলাম না- আসিফ
 

 

অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ সক্রিয় ছিল, তবে আমি সদস্য ছিলাম না: আসিফ মাহমুদ

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনায় একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন কেবিনেট’ বা অলিখিত নীতিনির্ধারণী গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল বলে নিশ্চিত করেছেন ওই সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বর্তমান মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে তিনি নিজে সরকারের ভেতরে থাকা এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন না বলে পরিষ্কার জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার (২৬ মে ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। ঝিনাইদহে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে দলের অবস্থান জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের পর নতুন বিতর্ক:

সম্প্রতি সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেনের একটি গণমাধ্যমে দেওয়া বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারের পর ‘কিচেন কেবিনেট’ ইস্যুটি দেশজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। তৌহিদ হোসেন দাবি করেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় ৭ সদস্যের একটি অদৃশ্য কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল, যারা প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় বসে গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিত এবং তাদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আজ সেই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র প্রতিনিধি ও সাবেক স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, “কিচেন কেবিনেট ছিল, এটা সত্য। কিন্তু আমি সেটার সদস্য ছিলাম না।” উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম উপদেষ্টা পরিষদ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।

আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি ও ‘ব্লেম গেম’:

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সই করা বহুল আলোচিত ‘বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি এটিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একটি রাজনৈতিক চাল হিসেবে উল্লেখ করেন।

আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা মনে করি, এই চুক্তিটা মূলত বিএনপিই করেছে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে তাদেরই বিশ্বস্ত তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (যিনি বর্তমানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) খলিলুর রহমানকে দিয়ে তারা এটা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এখন এটি নিয়ে একটি নোংরা ‘পলিটিক্যাল ব্লেম গেম’ বা রাজনৈতিক দোষারোপের খেলা চলছে।”

তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্যের সুর টেনে বলেন, “অনেকে দাবি করছেন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সব দলের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি আমার দলের আহ্বায়কসহ সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি—চুক্তির বিষয়ে কেউ এনসিপি বা জামায়াতের মতামত (কনসার্ন) নেয়নি। যেহেতু চুক্তিটি বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানই করেছেন, তাই ব্লেম গেম বন্ধ করে সরকার চাইলে এই ক্ষতিকর চুক্তিটি পর্যালোচনা বা বাতিল করতে পারে।”

‘মনে হচ্ছে রাজতন্ত্রে বসবাস করছি’—তীব্র সমালোচনা:

সংবাদ সম্মেলনে আসন্ন ঈদুল আজহার পশুর হাট এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এনসিপির এই মুখপাত্র। পশুর হাটের ইজারা প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, “এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের প্রায় সব পশুর হাটের ইজারা একচেটিয়াভাবে বিএনপির লোকজন পেয়েছে। এমনকি মেট্রো স্টেশনের নিচেও হাটের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর যারা অফিশিয়ালি হাট পায়নি, সেই স্থানীয় নেতারা পাড়ায় পাড়ায় অবৈধ হাট বসিয়ে জোরপূর্বক হাসিল আদায় করছে।” ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও পরিবহন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) দলীয় ও পারিবারিক প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করে সাবেক এই ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, “বিসিবিতে এখন যে ধরনের পরিবারতন্ত্রের প্রভাব চলছে, তা দেখে মনে হচ্ছে আমরা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নয়, বরং একটা রাজতন্ত্রে বসবাস করছি। অথচ ক্ষমতা গ্রহণের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলেছিলেন তাঁরা ক্রীড়াক্ষেত্রকে দলীয়করণ করবেন না। তাঁরা আসলে সত্যি কথাই বলেছিলেন—তাঁরা দলীয়করণ করেননি, সরাসরি ‘পরিবারকরণ’ করেছেন! আর এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এখন সবাই ভয়ে চুপ করে আছে।”

সংবাদ সম্মেলনে ঝিনাইদহের হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বক্তব্য রাখেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ সময় দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, এস এম সাইফ মোস্তাফিজসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top