হজের খুতবায় তাকওয়া ও তাওহিদের ওপর অবিচল থাকার আহ্বান
 

 

তাকওয়া অবলম্বন ও তাওহিদের ওপর অবিচল থাকার আহ্বান: আরাফাহর ময়দানে হজের ঐতিহাসিক খুতবা

বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলন পবিত্র হজের সবচেয়ে প্রধান ও অন্যতম ফরজ রুকন হিসেবে সউদী আরবের ঐতিহাসিক আরাফাহর ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ১৮ লাখের বেশি শান্তিকামী মুসলমান। মঙ্গলবার (২৬ মে ২০২৬) জিলহজ মাসের ৯ তারিখ দুপুরে নিমরাহ মসজিদ থেকে সমবেত লাখো হাজির উদ্দেশে হজের ঐতিহাসিক খুতবা প্রদান করা হয়েছে। এবারের হজের খুতবা প্রদান করেছেন বিশ্বখ্যাত প্রবীণ আলেম ও মসজিদে নববির সম্মানিত খতিব শায়খ আলী আল হুজাইফি।

খুতবার শুরুতে শায়খ আলী আল হুজাইফি মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রশংসা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করেন। এরপর তিনি উপস্থিত হাজি সাহেবরাসহ টেলিভিশনে ও রেডিওর মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার দেখা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন ও তাওহিদের ওপর অবিচল থাকার জোর আহ্বান জানান।

কঠিন কিয়ামত ও তাকওয়ার গুরুত্ব:

শায়খ আলী আল হুজাইফি মানবজাতিকে সম্বোধন করে বলেন, “হে মানবসকল! আপনারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি অবলম্বন করুন। কারণ একমাত্র তাকওয়ার মাধ্যমেই পরকালে আল্লাহর আজাব থেকে মুক্তি এবং জান্নাত লাভ সম্ভব।” তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা হজের শুরুর আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, কিয়ামতের ভূকম্পন এক ভয়ানক ব্যাপার। সেদিন স্তন্যদাত্রী মা তার সন্তানকে ভুলে যাবে এবং গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হবে। আল্লাহর আজাব অত্যন্ত কঠিন, তাই দুনিয়ার জীবনেই নেক আমল এবং সব ধরনের পাপাচার বর্জনের মাধ্যমে আমাদের সেই কঠিন দিবসের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

তাওহিদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক বর্জন:

খুতবায় সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে বলা হয়, পরকালের মুক্তির জন্য সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক প্রস্তুতি হলো ‘তাওহিদ’ বা আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং তিনি ছাড়া অন্য কাউকে বিপদ-আপদে না ডাকা। আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুর ইবাদত করা যা মানুষের ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পারে না, তা চরম পথভ্রষ্টতা। যারা আল্লাহর সাথে শরিক (শিরক) করে, তাদের আমলনামা ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং তাদের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ঈমানদারদের আসল স্লোগান হলো তাওহিদ এবং ইসলামের মূল রোকনগুলোর (নামাজ, জাকাত, রোজা ও হজ) যথাযথ বাস্তবায়ন।

ধৈর্য ও আরাফাহর শ্রেষ্ঠ দোয়া:

উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশে খতিব বলেন, আল্লাহর আনুগত্য এবং কষ্টদায়ক তাকদিরের ওপর সর্বদা ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কারণ ধৈর্যশীলদের পুরস্কার বিনা হিসাবে দেওয়া হবে। একই সাথে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ও কোরবানির পশুর জন্য তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার তাগিদ দেওয়া হয়।

খুতবায় আল্লাহর খলিল হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আমল ও ত্যাগের কথা স্মরণ করে হজের বিভিন্ন বিধান ও নিয়মাবলি আলোচনা করা হয়। শায়খ হুজাইফি বলেন, আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার অন্যতম প্রধান উপায় হলো বেশি বেশি দোয়া করা। বিশেষ করে হজের এই দিনগুলো এবং আরাফাহর ময়দান দোয়া কবুলের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস উল্লেখ করে বলেন, সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া।

বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সউদী নেতৃত্বের জন্য দোয়া:

খুতবার শেষ অংশে শায়খ আলী আল হুজাইফি বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে প্রার্থনা করেন, “হে আল্লাহ! আপনি হাজীদের হজ ও ইবাদত কবুল করুন। তাদের জীবনের সমস্ত গুনাহ ও ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে নিরাপদে নিজ নিজ দেশে ফেরার তওফিক দিন। বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের সংকট ও দুরবস্থা দূর করে দিন এবং সত্যের ওপর সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করুন।”

একই সাথে তিনি সউদী আরবের বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে হারামাইন শরিফাইনের (মক্কা ও মদিনা) খেদমত এবং আল্লাহর মেহমানদের সর্বোত্তম সেবা করার জন্য উত্তম জাজা ও নেক তওফিক কামনায় বিশেষ দোয়া করে হজের খুতবা সমাপ্ত করেন। খুতবা শেষে হাজিগণ আরাফাহর ময়দানে কসর করে একত্রে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইবাদতে মগ্ন থাকেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top