মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ ও ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ইরানের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন আরব বিশ্বের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। শনিবার (২৩ মে ২০২৬) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপে আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা যুদ্ধ বন্ধে দ্রুত একটি টেকসই কূটনৈতিক সমাধানের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। একই সময়ে তেহরানে চলমান আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা থেকেও স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্ভাব্য একটি ঐতিহাসিক সমঝোতার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পরামর্শ ও ট্রাম্পের ‘ফিফটি-ফিফটি’ অবস্থান:
আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর নেতারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি (Framework Agreement) বা সমঝোতা স্মারক গ্রহণ করার জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, এই অন্তর্বর্তী সমঝোতা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। হোয়াইট হাউস ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক মহল এই ফোনালাপটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছে।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে এই মুহূর্তে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা “ফিফটি-ফিফটি” (৫০-৫০) অবস্থায় রয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, রবিবারের (২৪ মে) মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ বাহিনীর নতুন কোনো বড় সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি হোয়াইট হাউসে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, “আলোচনা সফল হলে একটি দুর্দান্ত চুক্তি হতে পারে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোর ও ধ্বংসাত্মক সামরিক পথ বেছে নেবে।”
পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা:
কাতার ও পাকিস্তানের দ্বৈত মধ্যস্থতায় তেহরানের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বেশ কিছু বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন যে, পর্দার আড়ালে ব্যাপক ও নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে বিশ্ববাসী বড় কোনো ঘোষণা দেখতে পেতে পারে।
এই বৈশ্বিক মধ্যস্থতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও যুক্ত রয়েছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি তাঁর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রভাবশালী উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ করছেন। একই সময়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকেও হোয়াইট হাউসের জরুরি নীতি-নির্ধারণী কক্ষে দেখা গেছে, যা বাইডেন-পরবর্তী ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ তৎপরতারই বহিঃপ্রকাশ।
ইসরায়েলের উদ্বেগ ও ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ চাপ:
এদিকে পুরো পরিস্থিতির দিকে চরম সতর্ক ও ক্ষুব্ধ দৃষ্টি রাখছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তের যোগাযোগ রাখছেন। তেল আবিবের মূল আশঙ্কা হলো—সম্ভাব্য এই চুক্তিটি যদি কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং এতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের শর্ত বাদ পড়ে, তবে তা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদে এক ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য নরম সুর নিয়ে তীব্র ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। কট্টরপন্থী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ও রজার উইকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের ‘দুর্বল চুক্তি’ ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যা আমেরিকার মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।
তেহরানের মূল এজেন্ডা:
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো—চলমান যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করা, ওমান ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সিস্টেমে আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবমুক্ত করা। তবে বর্তমান শান্তি আলোচনায় ইরানের নিজস্ব পরমাণু কর্মসূচির বিষয়টি কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্ত নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টার নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনা একটি চূড়ান্ত সমঝোতার মজবুত পথ তৈরি করেছে। তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সুর চড়িয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ইরান তার জাতীয় ও সার্বভৌম অধিকার থেকে একচুলও সরে আসবে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি শান্তি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে আবারও যুদ্ধ শুরু করে, তবে তার পরিণতি হবে অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ।”







