তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যখন একের পর এক কর্মসংস্থানের জন্য আতঙ্ক তৈরি করছে এবং বৈশ্বিক টেক জায়ান্টগুলোতে চলছে গণ-ছাঁটাই, ঠিক তখনই এক নাটকীয় ও অসমসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত টেক এক্সিকিউটিভ ইউসুফ ইমরান। গুগল (Google) থেকে বছরে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার—যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি টাকা—আয় করার পরও তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই প্রযুক্তি জায়ান্টের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছেন। কর্পোরেট অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এআই প্রযুক্তির নতুন জোয়ারে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ার তাগিদ থেকে এই লোভনীয় চাকরিটি ছেড়েছেন তিনি।
সরাসরি গুগলের ‘অ্যাকাউন্ট এক্সিকিউটিভ’ হিসেবে কর্মরত ইউসুফ ইমরান সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডার (Business Insider)-এ লেখা এক বিশেষ নিবন্ধে নিজের এই রোমাঞ্চকর পথচলা ও চাকরি ছাড়ার নেপথ্যের ভেতরের গল্প খোলামেলাভাবে শেয়ার করেছেন।
কুইন্সের লড়াকু অভিবাসী থেকে গুগলের শীর্ষ সেলস এক্সিকিউটিভ
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে পরিবারের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের কুইন্সে পাড়ি জমান ইউসুফ ইমরান। বড় হয়েছেন এক লড়াকু অভিবাসী মানসিকতা নিয়ে, যেখানে তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন—কঠোর পরিশ্রম ও মেধার কোনো শর্টকাট নেই। প্রাতিষ্ঠানিক কাগজের সার্টিফিকেটের চেয়ে নিজের বাস্তব যোগ্যতা ও চাতুর্য প্রমাণ করতে তিনি ‘সেলস বা বিক্রয়’ পেশাকে বেছে নেন।
টানা ১৫ বছর এই খাতে সফলতার স্বাক্ষর রাখার পর ২০২০ সালে তিনি গুগলে যোগ দেন। গুগলে তাঁর মূল কাজ ছিল বিশ্বের বড় বড় করপোরেট গ্রাহকদের ব্যবসায়িক জটিলতা সমাধানে গুগলের তৈরি এআই এবং মেশিন লার্নিং (ML) পণ্যের সঠিক ব্যবহারে কারিগরি ও বাণিজ্যিক সহায়তা দেওয়া। গত বছর গুগলে তাঁর মূল বেতন (Base Salary) ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। তবে সেলস পারফরম্যান্সের ওপর পাওয়া বিপুল কমিশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে বছরে তাঁর মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ ৮৬ হাজার ডলার (প্রায় ১০ লাখ ডলার বা ১২ কোটি টাকা)।
কেন ছাড়লেন স্বপ্নের ‘সোনার হরিণ’?
টাকার অঙ্কে এই চাকরিটি যে কারও জন্য স্বপ্নের মতো হলেও দুটি মূল মনস্তাত্ত্বিক বিষয় ইউসুফকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে:
-
ইক্যুইটি বা শেয়ারের লোভনীয় অফার: ইউসুফ লক্ষ্য করেন, ওপেনএআই (OpenAI) বা অ্যানথ্রোপিক (Anthropic)-এর মতো নতুন এআই স্টার্টআপ কোম্পানিগুলো তাদের শুরুর দিকের কর্মীদের যে পরিমাণ ইক্যুইটি বা শেয়ার দিচ্ছে, তা গুগলের চেয়েও অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও জীবন বদলে দেওয়ার মতো। তিনি ভাবেন, অন্যের কোম্পানির শেয়ারের মূল্যের পেছনে না ছুটে নিজের কোম্পানির জন্য কেন খাটবেন না?
-
গুগলের নির্মম কর্মী ছাঁটাই ও আতঙ্ক: বিগত কয়েক বছরে গুগলে ঘটে যাওয়া দফায় দফায় নিষ্ঠুর কর্মী ছাঁটাই ইউসুফকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি অবাক হয়ে দেখেন, কোনো ধরনের পূর্বসংকেত ছাড়াই অবিশ্বাস্য রকমের প্রতিভাবান ও দক্ষ কর্মীরাও এক নিমেষে চাকরি হারাচ্ছেন। এই কর্পোরেট অনিশ্চয়তা তাঁকে অন্যের অধীনে না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
জিলিপি বা সফটওয়্যার কোডিং না জেনেই ‘ভাইব কোডিং’-এ বাজিমাত!
পেশাগতভাবে কোনো সফটওয়্যার ডেভেলপার বা কোডার না হওয়া সত্ত্বেও ইউসুফ কীভাবে নিজের এআই ল্যাব তৈরি করলেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। ইউসুফ ইমরান তাঁর নিবন্ধে বলেন:
“দিনের বেলা আমি যেখানে গুগলের হয়ে এআই পণ্য বিক্রি করতাম, রাতের বেলা আর ছুটির দিনগুলোতে আমি নিজেই চ্যাটজিপিটি, ক্লদ এবং জেমিনির মতো টুলগুলো নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতাম। কোনো কিছু কোডিং করার জন্য আমি একাধিক এআই টুলের সাহায্য নিতাম এবং বেশ কয়েকবার চেষ্টা ও ভুলের (Trial and Error) মধ্য দিয়ে অবশেষে সফল হতাম। এই ‘ভাইব কোডিং’ (Vibe Coding – অর্থাৎ এআই-এর সাহায্যে নিজে কোড না লিখে কোড করিয়ে নেওয়া) আমার কাছে অনেকটা ভিডিও গেম খেলার মতো মনে হতো।”
প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি এভাবে চাকরির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অ্যাপ এবং সাইড প্রজেক্ট তৈরি করেন এবং নিজের একটা স্বাধীন ব্যবসা শুরু করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই একাই গড়লেন ‘ম্যাঙ্গোস্টিন স্টুডিও’
চাকরি ছাড়ার আগে ইউসুফ নিজেকে আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ বুটস্ট্র্যাপড বা সুরক্ষিত করে নিয়েছিলেন। কোনো বাইরের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা বিনিয়োগ ছাড়াই নিজের ব্যবসাকে অন্তত দুই বছর টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি ২ লাখ ডলার এবং নিজের ব্যক্তিগত ও বন্ধকী (Mortgage) খরচ মেটানোর জন্য আরও ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের নিজস্ব সঞ্চয় জমা করেন।
চলতি বছরের এপ্রিলে গুগলে দীর্ঘ ৬ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি টেনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ম্যাঙ্গোস্টিন স্টুডিও’ (Mangosteen Studio) নামের একটি এআই প্রোডাক্ট ল্যাব। ২০ বছর সেলস লাইনে কাটানো ইউসুফ এখন এমন সব এআই টুল ও ‘গো-টু-মার্কেট’ (GTM) সফটওয়্যার তৈরি করছেন, যা বিশ্বব্যাপী সেলস এক্সিকিউটিভদের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করে তুলবে। বর্তমানে একজন একক প্রতিষ্ঠাতা (Solo Founder) হিসেবে একদল দূরদর্শী ইঞ্জিনিয়ার ও মার্কেটারদের সাথে নিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন এই অদম্য বাংলাদেশি।
ইউসুফ ইমরানের মতে, “যারা প্রথাগত গণ্ডির বাইরে গিয়ে ঝুঁকি নিতে ভালোবাসেন, এআই প্রযুক্তি তাঁদের জন্য ডানা মেলার ও দারুণ সব নতুন সুযোগের এক অনন্ত দুয়ার খুলে দিচ্ছে।”







