কাশ্মীরের চিরবৈরী ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের আঁচ এবার এসে লাগল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। সার্ক (SAARC) পুনরুজ্জীবিতকরণ সংক্রান্ত একটি হাই-প্রোফাইল সেমিনারে জম্মু ও কাশ্মীরের মানচিত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ভারতের নারী কূটনীতিক ও পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনারের মধ্যে নজিরবিহীন উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) সরকারের থিংক-ট্যাংক হিসেবে পরিচিত ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (BIISS) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘রিবিল্ডিং ট্রাস্ট, রিনিউইং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শীর্ষক সেমিনারে এই ঘটনা ঘটে।
বক্তব্য থামিয়ে মাঝপথেই ভারতীয় নারী কূটনীতিকের তীব্র প্রতিবাদ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করছিলেন সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত সাবেক কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা।
তারিক এ করিম তাঁর প্রবন্ধ উপস্থাপনার সময় স্লাইডে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র প্রদর্শন করেন। মানচিত্রটি স্ক্রিনে দেখানোর সাথে সাথেই সেমিনারে উপস্থিত ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা বসা থেকে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বক্তব্য চলাকালেই তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন।
ভারতীয় কূটনীতিক পূজা কুমারী সাফ বলেন:
“এখানে ভারতের যে মানচিত্রটি প্রদর্শন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও সার্বভৌম অংশ। এখানে সেটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাই আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং বিষয়টি রেকর্ড করার দাবি করছি।”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মূল প্রবন্ধকার তারিক এ করিম করজোড়ে বা নরম সুরে বোঝানোর চেষ্টা করে বলেন, মানচিত্রটি কেবল উপস্থাপনার সুবিধার্থে ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে এবং এটি কোনো প্রকৃত আন্তর্জাতিক সীমারেখা নির্দেশ করে না। কিন্তু পূজা কুমারী তাঁর দাবিতে অনড় থাকেন।
পরিচয় জেনেই চুপসে গেলেন বিতর্কিত কূটনীতিক তারিক করিম!
একপর্যায়ে কিছুটা রাগান্বিত হয়ে তারিক এ করিম ওই নারী কর্মকর্তার উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, “আপনার পরিচয় কী?” জবাবে পূজা কুমারী ঝা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমার নাম পূজা কুমারী ঝা। আমি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভারতীয় হাইকমিশনের শীর্ষ পদের কর্মকর্তার পরিচয় পাওয়ার সাথে সাথেই মঞ্চে রীতিমতো চুপসে যান এবং ভড়কে যান সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর সুর নরম করে বলেন, “ঠিক আছে, আপনার উপস্থাপিত আপত্তিটি আমরা অফিশিয়াল নোটে নথিভুক্ত (Recorded) করে নিলাম।” এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের কিছুক্ষণ পরেই সেমিনার শেষ হওয়ার আগেই মিলনায়তন ত্যাগ করেন ভারতীয় কূটনীতিক।
“ভারতের সংকীর্ণ মানসিকতার কারণেই সার্ক অচল” — পাকিস্তান
ভারতীয় কূটনীতিকের এই মারমুখী আপত্তির পরপরই সেমিনারে উপস্থিত পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ ওয়াসিফ হাত তুলে স্পিকার তারিক করিমের উদ্দেশে বলেন, “কাশ্মীর ইস্যুতে আমাদেরও শক্ত বক্তব্য রয়েছে, আমাদের বলতে দেওয়া হোক।” কিন্তু তারিক করিম ভারতীয় কূটনীতিকের পরিচয় পেয়ে ভড়কে গেলেও পাকিস্তানি ডেপুটি হাইকমিশনারকে কথা বলার কোনো সুযোগই দেননি। তিনি বলেন, সেমিনার শেষে এ নিয়ে কথা বলা যাবে। যদিও সেমিনার শেষে তিনি আর সুযোগ দেননি।
পরে সেমিনার শেষে লবিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ ওয়াসিফ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“আজকের সেমিনারে ভারতের যে আগ্রাসী আচরণ আপনারা দেখলেন, তাতেই তাদের মানসিকতার আসল পরিচয় স্পষ্ট হয়ে গেছে। ভারতের এই চরম অহংকারী ও সংকীর্ণ মানসিকতার কারণেই সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক কোনো মেগা প্রতিষ্ঠানই গত এক দশক ধরে কার্যকর হতে পারছে না। তাদের এই দাদাগিরি ও সংকীর্ণ মানসিকতাই দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশনের পথে প্রধান অন্তরায়।”
ঢাকায় সেমিনারে তীব্র অস্বস্তি, প্রশ্ন— ‘জয় হিন্দ’খ্যাত ফ্যাসিবাদের দোসর কেন স্পিকার?
ঢাকায় সরকারি একটি থিংক ট্যাংকের সেমিনারে দুই পারমাণবিক পরাশক্তির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মুখোমুখি অবস্থানে উপস্থিত কূটনীতিক ও সুধীসমাজের মধ্যে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারতীয় কূটনীতিকের যদি আপত্তি থাকত, তবে তিনি শিষ্টাচার মেনে বক্তব্য শেষে প্রশ্নোত্তরের সময় তা তুলতে পারতেন। কিন্তু রানিং স্পিকারের বক্তব্য থামিয়ে যেভাবে হট্টগোল করা হয়েছে, তা কূটনৈতিক প্রটোকলের পরিপন্থী।
পাশাপাশি, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, শেখ হাসিনার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও বিতর্কিত কূটনীতিক তারিক এ করিমকে কীভাবে বিআইআইএসএস (BIISS)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকের চেয়ার দেওয়া হলো—তা নিয়ে মিলনায়তনেই অনেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কে এই তারিক এ করিম?
২০০৯ সালে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক তারিক এ করিমকে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি দিল্লিতে দায়িত্ব পালনকালে এতটাই ভারত-তোষণ নীতিতে মগ্ন ছিলেন যে, ২০১০ সালে শেখ হাসিনার দিল্লি সফর উপলক্ষে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে যে অফিশিয়াল স্মারক পুস্তিকা বের করা হয়েছিল, সেখানে দেওয়া তাঁর নিজের বাণীর শেষ লাইনে বাংলাদেশের ‘জয় বাংলা’ না লিখে লিখেছিলেন—‘জয় হিন্দ’ (Jai Hind)। বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রদূতের এমন নজিরবিহীন ভারত-ভক্তি নিয়ে তখন দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও তোলপাড় হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর নতুন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের এমন সুবিধাভোগীকে রাষ্ট্রীয় মঞ্চে সুযোগ দেওয়া নিয়ে সেমিনারে উপস্থিত তরুণ গবেষকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।







