বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রতি মাসের মূল বেতনের ১০ শতাংশ টাকা রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিচ্ছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার সকল সদস্যকেও স্ব-স্ব বেতনের ১০ শতাংশ টাকা সরকারের তহবিলে জমা দেওয়ার জন্য অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) রাজধানীতে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি (বিএমএস) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
হুবহু কোট করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা বললেন ক্যাবিনেট মিটিংয়ের গল্প
রোববারের (৫ জুলাই) ক্যাবিনেট মিটিংয়ের ভেতরের দৃশ্যপট ও প্রধানমন্ত্রীর বিনম্র অনুরোধের কথা হুবহু কোট করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বলেন:
“গতকাল আমাদের একটা মিটিং হয়েছে। একটা দেশের প্রশাসনিক প্রধান ব্যক্তি, উনি আমাদের মিটিংয়ে কী বলেছেন জানেন? খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন— ‘মন্ত্রী মহোদয়গণ, আমি একটা কথা বলবো আজকে, বিনয় করে বলা, আপনারা রাখতেও পারেন আমার কথাটা, নাও রাখতে পারেন। তবে আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখেছি, আপনাদের আমার বলা উচিত, এখন আপনাদের ইচ্ছা! যেটা বলব, আমি এটা করছি। আমার আব্বা (সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) প্রতি মাসে তাঁর বেতন থেকে ১০ শতাংশ বেতন সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতেন গরিব-মিসকিন মানুষদের সহযোগিতা করার জন্য বা সরকারি কোনো প্রয়োজনে খরচ করার জন্য। আমি কিন্তু বেতন নিচ্ছি, না নিয়ে চলতে পারতেছি না। আমার বেসিক বেতন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, ১০ শতাংশ হারে আমি ১১ হাজার ৫০০ টাকা প্রতি মাসে বেতন থেকে জমা দিচ্ছি। বেতন যখন অ্যাকাউন্টে আসে আমি তুলে একটা চেক দিয়ে দেই গভর্নমেন্টের অ্যাকাউন্টে। আমি আপনাদের অনুরোধ করব, আমার আব্বা কাজটা করতেন, আমি করছি; আপনারাও যদি মনে কিছু না নেন বা যদি আপনাদের পক্ষে সম্ভব হয় আপনারাও প্রতি মাসে ১০ শতাংশ আপনাদের বেতনের টাকাটা সরকারের ঘরে ফেরত দিয়ে দেবেন।’”
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর এমন সততা ও দেশপ্রেমের অনন্য নিদর্শন দেখে ক্যাবিনেটের সকল সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে একে স্বাগত জানিয়েছেন এবং খুশি মনে এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন।
দালালচক্র ও সিজারিয়ানের নামে ‘ভয়ের বাণিজ্য’ বন্ধের কড়া হুঁশিয়ারি
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যখাতের একশ্রেণীর অতি-মুনাফাখোর মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে দেশের একটি শ্রেণী অতিমাত্রায় মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। মানুষের কল্যাণ বা দেশের স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একসময় দেশের অধিকাংশ সন্তান জন্ম হতো স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) মাধ্যমে। গ্রামাঞ্চলে অভিজ্ঞ দাইয়েদের মাধ্যমে এটি নিরাপদে সম্পন্ন হতো। কিন্তু এখন আধুনিকায়নের নামে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের (অপারেশন) প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
মন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ করে বলেন:
“গর্ভাবস্থার শুরুতে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর শেষ মুহূর্তে কিছু দালালচক্র এবং কতিপয় চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার ভুয়া ভয় দেখায়। ‘অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না’—এমন কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি করে পরিবারগুলোকে জোরপূর্বক সিজারিয়ানের সিদ্ধান্তে বাধ্য করা হয়। চিকিৎসকেরা মানুষের কাছে আল্লাহর পর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। তাই চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতার বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।”
স্বাস্থ্যখাতে ১ লাখ নতুন কর্মী নিয়োগ, ৮০ হাজারই নারী
মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর পুষ্টি সুরক্ষায় এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে দক্ষ মিডওয়াইফ বা ধাত্রীদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। এ সময় তিনি দেশের বেকার স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি মেগা সুখবর দিয়ে ঘোষণা করেন— চলতি ২০২৬ বছরই স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ (১,০০,০০০) নতুন কর্মী নিয়োগের মেগা পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজারই (৮০%) নারী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের একটি বিশাল অংশই মিডওয়াইফ (Midwife) হিসেবে সরাসরি প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করবেন।
একই সাথে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর মালিকদের আলটিমেটাম দিয়ে মন্ত্রী ঘোষণা দেন, “আগামী শনিবারের (১১ জুলাই ২০২৬) মধ্যে দেশের সকল বেসরকারি ক্লিনিকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘লেবার রুম’ (প্রসব কক্ষ) স্থাপন করতে হবে। কোনো ক্লিনিক এই রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা না মানলে তাদের লাইসেন্স সাথে সাথে বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটি চিরতরে সিলগালা বা বন্ধ করে দেওয়া হবে।”
রেজিস্ট্রেশন পেয়েও ঝরে পড়ছেন ৯১% দক্ষ ধাত্রী
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, একজন ধাত্রী বা মিডওয়াইফ ন্যূনতম ৪০টি সফল নরমাল ডেলিভারি করানোর পর প্রাতিষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন বা স্বীকৃতি পান। প্রতি বছর মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ জন ধাত্রী অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে সরাসরি কাজের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় এই বিপুল দক্ষ ধাত্রীদের সিংহভাগই (প্রায় ৯১ শতাংশ) ঝরে পড়েন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বছরে মাত্র ৫০০ জন ধাত্রী কাজ করার সুযোগ পান, বাকিরা সাধারণ নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হন। ফলে দক্ষ লোকের অভাবে প্রসবকালীন দুর্ঘটনা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির (বিএমএস) সভাপতি রোজিনা খাতুনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক হাসনা আখতারের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আখতারসহ নার্সিং খাতের ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ।







