বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই
 

 

বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

বাংলা একাডেমির সভাপতি, প্রথিতযশা প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রবিবার (৫ জুলাই ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর মিরপুরে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

বিখ্যাত এই গবেষক ও মননশীল লেখকের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে আকস্মিক অসুস্থতা

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিরপুরের একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিলেন। খাবার টেবিলে বসার পর আকস্মিকভাবে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে ওই ভবনেই অবস্থিত একটি স্থানীয় ক্লিনিকে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। হাসপাতাল থেকে পরে তাঁর মরদেহ মিরপুরের পল্লবীতে তাঁর নিজ বাসভবনে নিয়ে আসা হয়।

শোকসন্তপ্ত পরিবার ও ট্রাজিক অতীত

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মৃত্যুকালে স্ত্রী ফরিদা প্রধান, মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুচিতা শারমিন, পুত্রবধূ রাজিয়া রহমান এবং নাতি-নাতনিসহ দেশ-বিদেশে অসংখ্য ছাত্র ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক আবুল কাসেমের জীবনে এক নির্মম ও ট্রাজিক অধ্যায় রয়েছে। তাঁর একমাত্র ছেলে, জাগৃতি প্রকাশনীর সাহসেী প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর আজিজ সুপার মার্কেটে তাঁর নিজস্ব কার্যালয়ে উগ্রবাদী জঙ্গিরা কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ছেলের মৃত্যুর পরও শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীলতার চর্চা আজীবন ধরে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বাংলা একাডেমির সভাপতি পদে যোগদান করেন।

বর্ণাঢ্য জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন

১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী মানুষ। তিনি ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ছাত্রজীবনে তিনি প্রগতিশীল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি মার্ক্সবাদী ধারার রাজনীতিতেও অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন প্রগতিশীল সব গণ-আন্দোলন এবং উনসত্তরের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সামনের কাতারে ছিলেন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠনের সমস্ত সংযোগ ছিন্ন করেন এবং লেখার মাধ্যমে সমাজে প্রগতির আলো ছড়ানোর সংকল্প নেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ঢাকা শহরেই অবস্থান করেন এবং অবরুদ্ধ অবয়বের মাঝেই গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় প্রদান ও অর্থ সংগ্রহ করে দিয়ে অনন্য অবদান রাখেন।

শিক্ষকতা ও কালজয়ী সাহিত্যকর্ম

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ চার দশক অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষকতা করার পর ২০১১ সালের ৩০ জুন তিনি আনুষ্ঠানিক অবসরে যান। এরপরও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দুই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে মর্যাদাপূর্ণ ‘আহমদ শরীফ চেয়ার’ পদে নিয়োজিত ছিলেন।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আন্দোলনে আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম সাড়াজাগানো বই ‘মুক্তিসংগ্রাম’। ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি উচ্চমানের প্রগতিশীল সাময়িকপত্র সম্পাদনা ছাড়াও তাঁর ৩২টির মতো মৌলিক ও কালজয়ী গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’

  • ‘রাজনীতি দর্শন’

  • ‘সাহিত্য চিন্তা’

  • ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’

  • ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’

গবেষণায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেন। এছাড়া অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখক শিবির হুমায়ুন কবির স্মারক পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার এবং কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র থেকে ‘লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার’-এ ভূষিত হন তিনি।

জাতীয় নেতৃবৃন্দের গভীর শোক

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শাইরুল কবির খান জানিয়েছেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তিনি রাতেই প্রয়াত এই শিক্ষাবিদের মিরপুরের বাসভবনে সশরীরে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top