এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে এবং নিজের ‘অসংগতিপূর্ণ’ মন্তব্যের তীব্র সমালোচনার জেরে অবশেষে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বন্যাকবলিত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদে অবহিত করেন মন্ত্রী।
“উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বলিনি, কেউ আহত হলে সিম্প্লি দুঃখিত”
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের একটি ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার বিষয়ে সংসদে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন শিক্ষামন্ত্রী।
সংসদে তিনি বলেন:
“আমার একটি ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাইরে আপত্তি জানিয়েছেন। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা কাউকে ছোট করতে কিছু বলিনি। তারপরও আমার সেই কথায় কেউ যদি মনে কষ্ট পেয়ে থাকেন বা আহত হয়ে থাকেন, তবে ‘সিম্প্লি’ (সহজভাবে) আমি তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।”
স্থগিত হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার নতুন ফর্মুলা
চট্টগ্রাম বিভাগে প্রলয়ংকরী বন্যার কারণে স্থগিত হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাগুলো নিয়ে পরীক্ষার্থীদের দাবি ও মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা স্থগিত করতে হলেও এই পরীক্ষাগুলো শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের স্বার্থেই পুনরায় নিতেই হবে।
শিক্ষামন্ত্রী নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেন, চট্টগ্রাম বোর্ডের জন্য যখন পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, যুক্তিবিদ্যা এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা অন্য আরেকটি নতুন প্রশ্নপত্র সেটে নেওয়া হবে, ঠিক সেই সময়েই আগের স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলোও একসাথে নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করবে মন্ত্রণালয়।
উল্লেখ্য, টানা বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্থ সব জেলায় গত ৮, ১১, ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পরীক্ষাগুলো স্থগিত ঘোষণা করেছিল।
সংসদ ভবন ঘেরাও, পুলিশি অ্যাকশন ও শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ স্লোগান
সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর এই দুঃখ প্রকাশের ঠিক আড়াই ঘণ্টা আগে বিকেল থেকে রাজধানীর রাজপথ এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে।
-
সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিল: বিকেল সোয়া ৫টার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের উদ্দেশে রওনা হন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তারা সংসদ ভবনের মূল ফটকের সামনে পৌঁছে অবস্থান নেন এবং অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করেন।
-
লাঠিচার্জ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া: সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ধানমন্ডি আড়ংয়ের সামনে পুনরায় অবস্থান নিয়ে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে এলাকাছাড়া করে।
-
‘ফার্মের মুরগি’ স্লোগান: দিনভর অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীকে কটাক্ষ করে রাজপথে স্লোগান দেন, “তুমি কে আমি কে- ফার্মের মুরগি, কে বলেছে কে বলেছে- শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী।”
পরীক্ষার্থীদের ৩ দফা দাবি
এর আগে বিকেল ৫টার দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে ঢাকা সিটি কলেজের পরীক্ষার্থী মো. মিরাজ হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে ৩ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলো ছিল:
১. সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং তাঁর ‘অসংগতিপূর্ণ’ বক্তব্যের জন্য জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
২. গত ১৩ জুলাই ভয়াবহ বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা পরীক্ষা দিয়েছেন এবং যারা কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পেরে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, সবার কথা বিবেচনা করে ওই দিনের পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় নতুনভাবে নিতে হবে।
৩. চলমান সংকট নিরসনে দ্রুত নতুন শিক্ষার্থীবান্ধব পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ এবং প্রশ্নপত্রের মান সহজ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকার সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর ও উত্তরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। যার ফলে সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে পুরো রাজধানী জুড়ে স্থবিরতা এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।







