ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের চোখ আজ টেক্সাসের ওপর। ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের প্রথম সেমিফাইনালের মহারণে আজ মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি— ফ্রান্স ও স্পেন। টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফরাসিরা, অন্যদিকে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালের টিকিট কাটতে লড়বে স্প্যানিশরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসের আর্লিংটনে অবস্থিত এটিঅ্যান্ডটি (AT&T) স্টেডিয়ামে হাইভোল্টেজ ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) দিবাগত রাত ১টায়।
স্পেনই ফেভারিট, নিজেদের ‘আন্ডারডগ’ মানছেন দেশ্যম
চলতি টুর্নামেন্টে একের পর এক চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে আলো ছড়ালেও, হাইভোল্টেজ এই ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ স্পেনকেই পরিষ্কার ফেভারিট হিসেবে দেখছেন ফ্রান্সের হেড কোচ দিদিয়ের দেশ্যম। অপরদিকে স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছিল নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত গোলশূন্য ড্র দিয়ে। তবে এরপর লুইস ডি লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য ছন্দ ফিরে পেয়েছে।
ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে দিদিয়ের দেশ্যম বলেন:
“কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের কথা ভুলে যান। এরপর থেকেই স্পেন প্রতি ম্যাচে প্রমাণ করেছে যে তারাই টুর্নামেন্টের মূল ফেভারিট। আমি স্প্যানিশ কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে বা তার দলের ওপর বাড়তি মিডিয়া প্রেশার তৈরি করতে চাই না। কিন্তু বাস্তব এটাই যে, স্পেন আক্রমণে যেমন ক্ষুরধার, রক্ষণেও তেমনি জমাট। গত ছয়-সাত ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে। সাম্প্রতিক দেখায় আমরা তাদের কাছে হেরেছি, তাই আজ আমরাই আন্ডারডগ। তবে মাঠের লড়াইয়ে একটি ক্ল্যাসিক ম্যাচ হতে যাচ্ছে।”
ফরাসি কোচের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে স্পেনের প্রজ্ঞাবান কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানান:
“শুরু থেকেই আমি বলে আসছি, মানুষ আমাদের ফেভারিট বলুক বা না বলুক, মাঠে তাতে কোনো তফাত গড়ে ওঠে না। এর কোনো গুরুত্ব নেই এবং এটি ম্যাচের ফল নির্ধারণ করবে না। এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা দুটি দলের লড়াই। চাপ তো সেমিফাইনালে এমনিতেই থাকে, আমার দল এই চাপ সামলাতে শতভাগ অভ্যস্ত।”
এমবাপে শতভাগ ফিট, আলাদা পরিকল্পনা ইয়ামালকে নিয়ে
ফরাসি শিবিরের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের শেষ দিকে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ানো অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে সেমিফাইনালের জন্য এখন শতভাগ ফিট রয়েছেন।
তবে স্পেনের তরুণ বিস্ময় উইঙ্গার লামিন ইয়ামালকে নিয়ে আলাদা সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন দেশ্যম। ২০২৪ সালের ইউরো সেমিফাইনাল এবং গত বছরের উয়েফা নেশনস লিগে ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়ে গোল করেছিলেন এই খুদে জাদুকর। দেশ্যম বলেন, “আমি ইয়ামালের সামর্থ্য বিশ্লেষণ করেছি। সে মাঠে অনায়াসে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে তাকে সামলানো কঠিন, তবে আমাদের ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে লড়াই করাও স্পেনের জন্য সহজ হবে না।”
ইতিহাসের পাতায় ফ্রান্স-স্পেন ব্লকবাস্টার দ্বৈরথ: সেরা ৫ লড়াই
আজকের মেগা ম্যাচের আগে অতীতে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল টুর্নামেন্টে দু’দেশের মধ্যকার সেরা ৫টি রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের খতিয়ানে চোখ বুলানো যাক:
১. ইউরো ১৯৮৪ ফাইনাল (ফ্রান্স ২ : ০ স্পেন)
মিশেল প্লাতিনির নেতৃত্বে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছিল ফ্রান্স। স্পেনের গোলরক্ষক আরকোনাদার হাত ফসকে প্লাতিনির ফ্রি-কিক জালে জড়ালে লিড পায় ফরাসিরা। পরে ব্রুনো বেলোনের গোলে ২-০ ব্যবধানে শিরোপা নিশ্চিত হয়।
২. জার্মানি বিশ্বকাপ ২০০৬ (ফ্রান্স ৩ : ১ স্পেন)
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই ম্যাচে ডেভিড ভিয়ার পেনাল্টি গোলে স্পেন প্রথমে এগিয়ে গেলেও ফ্রাঙ্ক রিবেরি, প্যাট্রিক ভিয়েরা এবং ইনজুরি সময়ে জিনেদিন জিদানের অনবদ্য গোলে ৩-১ ব্যবধানের মহাকাব্যিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স।
৩. উয়েফা নেশনস লিগ ২০২১ ফাইনাল (ফ্রান্স ২ : ১ স্পেন)
মিকেলের গোলে স্পেন এগিয়ে যাওয়ার মাত্র ২ মিনিট পরই কিলিয়ান এমবাপের অ্যাসিস্ট থেকে সমতা ফেরান করিম বেনজেমা। পরে ৮০ মিনিটে এমবাপে নিজেই জয়সূচক গোল করে দিদিয়ের দেশ্যমকে ২০১৮ বিশ্বকাপের পর দ্বিতীয় শিরোপা এনে দেন।
৪. ইউরো ২০২৪ সেমিফাইনাল (স্পেন ২ : ১ ফ্রান্স)
রান্দাল কোলো মুয়ানির হেডে ফ্রান্স প্রথমে লিড নিলেও নিজের ১৭তম জন্মদিনের ঠিক ৪ দিন আগে ডি-বক্সের বাইরে থেকে চোখধাঁধানো বাঁকানো শটে গোল করে সমতা আনেন লামিন ইয়ামাল। পরে দানি ওলমোর গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে যায় ও চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
৫. উয়েফা নেশনস লিগ ২০২৫ সেমিফাইনাল (স্পেন ৫ : ৪ ফ্রান্স)
গত বছরের জুন মাসে স্টুটগার্টে হওয়া ৯ গোলের এক অবিশ্বাস্য থ্রিলার! নিকো উইলিয়ামস, মেরিনো, পেদ্রি ও ইয়ামালের জোড়া গোলে একপর্যায়ে ৫-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন। পরে এমবাপে, চেরকি ও মুয়ানির গোলে ফ্রান্স ৪-৫ ব্যবধানে কামব্যাক করলেও শেষরক্ষা হয়নি।
এছাড়া ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের স্বর্ণপদক জয়ের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচেও ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়েছিল স্পেন। আজকের ম্যাচটি তাই ফরাসিদের জন্য যেমন প্রতিশোধের, তেমনি স্প্যানিশদের জন্য আধিপত্য ধরে রাখার।







