হাদি হত্যায় শুটারদের গ্রেপ্তারের খবর গোপন করতে অমিত শাহর ফোন
 

 

হাদি হত্যাকাণ্ডের শুটারদের গ্রেপ্তারের খবর চাপতে ফোন করেছিলেন অমিত শাহ: বিস্ফোরক দাবি মমতার

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর মাত্র মাসখানেক পর কলকাতার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু ধর্মতলায় আয়োজিত এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে এক অভূতপূর্ব বোমাবর্ষণ করলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও সদ্যসাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশে সংঘটিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি কাঁপানো বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২ জুন ২০২৬) ধর্মতলার মঞ্চ থেকে মমতা সরাসরি ইঙ্গিত দিয়ে দাবি করেন, হাদি খুনের সঙ্গে জড়িত মূল আততায়ীরা মেঘালয় সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু সেই খবর যাতে কোনোভাবেই জনসমক্ষে না আসে, তার জন্য খোদ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে যাওয়ার জোরালো অনুরোধ করেছিলেন।

মমতার জবানবন্দি: ‘আমার হৃদয় তথ্যের ভাণ্ডার’

অবস্থান ধর্মঘটে বক্তব্য রাখার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ফোনে হওয়া সেই গোপন কথোপকথন ফাঁস করে বলেন:

“বাংলাদেশের এক বড় খুনিকে আমাদের এসটিএফ (স্পেশাল টাস্কফোর্স) গ্রেপ্তার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার বলার অধিকার নেই। কিন্তু আমি যেটা বলছি, তারপরে তারা (খুনি) মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। তখন আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। এটা এসটিএফের ক্রেডিট। তারপরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে নিজে ফোন করেন।”

সদ্যসাবেক মুখ্যমন্ত্রী আরও যোগ করেন, “এতদিন তো আমি বলিনি। আজ অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছে বলে বলছি। আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে। আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি।” এ সময় জনসভায় উপস্থিত তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকরা চিৎকার করে মূল আসামির নাম বলে দেওয়ার অনুরোধ জানালে মমতা তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “না বলব না দেশের স্বার্থে। (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বললেন, ‘আপ থোড়া আপকো বেঙ্গল পুলিশকে বোল দো, এ বাত বাহার মে নেহি কেহনে কে লিয়ে’ (আপনি পশ্চিমবঙ্গের পুলিশকে একটু বলে দেন, এই কথাটা যেন বাইরে না যায়)। এটি দেশের জন্য।”

এরপরই সরাসরি নয়াদিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে ইঙ্গিত করে মমতা প্রশ্ন তোলেন, “কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ (পশ্চিমবঙ্গে) সরকার পরিবর্তন হলেও আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয় তো একটা কথার ভাণ্ডার, তথ্য ভাণ্ডার, সত্য ভাণ্ডার।” তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশে তুমুল আলোড়ন ও দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় তিনি আপাতত মূল চক্রের নাম মুখে আনছেন না।

কে এই ওসমান হাদি? কেন এই খুন এতটা সংবেদনশীল?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিস্ফোরক দাবির পর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— কে এই ওসমান হাদি এবং কেন তাঁর মৃত্যুর পেছনে এত বড় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে?

  • পরিচিতি: ৩২ বছর বয়সী শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত ও তাত্ত্বিক মুখ এবং যুবসমাজের প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মুখপাত্র। ঝালকাঠির এক মাদ্রাসা শিক্ষকের সন্তান হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।

  • রাজনৈতিক অবস্থান: শেখ হাসিনার পতনের পর হাদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রখর ও আপসহীন ‘ভারত-বিরোধী কণ্ঠস্বর’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক সোচ্চার থাকায় দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষের কাছে তিনি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

  • হত্যাকাণ্ড: এই রাজনৈতিক উত্থানের মাঝেই ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে জুমার নামাজ শেষে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা আততায়ীরা খুব কাছ থেকে তাঁর মাথায় গুলি করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল ও এভারকেয়ার হয়ে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই মৃত্যুতে বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।

তদন্তের সুতো ও পশ্চিমবঙ্গে এসটিএফের গোপন অভিযান

হাদি হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে নেমে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জানিয়েছিল, হাদিকে সরাসরি গুলি করা মূল শুটার ছিল ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার প্রধান সহযোগী আলমগীর হোসেন। অপরাধ সংঘটিত করার পরপরই এই দুই শুটার অবৈধ উপায়ে ভারতে পালিয়ে যায়।

চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুতে এই ফয়সাল এবং আলমগীরকে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ। একই সাথে তাদের সীমান্ত পার হতে সাহায্য করার অভিযোগে ফিলিপ সাংমা নামে মেঘালয়ের এক ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এতদিন এই গ্রেপ্তারির বিষয়টি এসটিএফের একটি সফল ও নিয়মিত অভিযান হিসেবে দেখা হলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঙ্গলবারের মন্তব্য এই ঘটনাকে স্রেফ একটি হত্যাকাণ্ড থেকে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা অমিত শাহের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top