আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে স্পেন দলের জন্য গাজাবাসীর প্রার্থনা
 

 

বিশ্বকাপ ফাইনাল আজ: আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের লা রোজাদের জন্য গাজাবাসীর অকুণ্ঠ প্রার্থনা

আজ রবিবার (১৯ জুলাই ২০২৬) দিবাগত রাতে বিশ্ব ফুটবলের মেগা মহারণে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন। হাইভোল্টেজ এই বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার অপেক্ষায় যখন পুরো বিশ্ব বুঁদ হয়ে আছে, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলছে ভিন্ন এক উন্মাদনা। গাজাবাসীর মাঝে এবার কোনো দ্বিধা নেই—তাদের অকুণ্ঠ ও প্রকাশ্য সমর্থন এখন স্পেনের ‘লা রোজা’ শিবিরের দিকে।

ফুটবলীয় শক্তির চেয়েও এখানে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবতা ও সংহতি। ইসরায়েলের চালানো দীর্ঘস্থায়ী গণহত্যামূলক যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনিদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো এবং স্প্যানিশ ফুটবল তারকাদের অব্যাহত মানবিক সংহতির কারণেই স্পেনের প্রতি গাজার এই ভালোবাসার জোয়ার।

“তারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে, আমরা তাদের ভালোবাসি”

আল জাজিরার বরাতে জানা যায়, ৩৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি যুবক আহমেদ আল-বোজম স্পেনের প্রতি নিজের আবেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমি এবার পুরোপুরি স্পেনের পক্ষে, কারণ তারা বুক চিতিয়ে ফিলিস্তিনের مظلوم মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।”

গত মে মাসে লা লিগা জয়ের পর ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন বার্সেলোনার তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল। তাকে উদ্দেশ্য করে আল-বোজম বলেন:

“ফিলিস্তিন থেকে আমরা আপনাকে গভীরভাবে ভালোবাসি, ইয়ামাল। আমরা মন থেকে আপনাদের পুরো দলকে সমর্থন করছি এবং আশা করি আজ রাতে আপনারা বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পাশাপাশি আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াবেন।”

ধ্বংসস্তূপের মাঝে ফুটবল উন্মাদনা: প্রতীকী ‘স্পেন বনাম ফিলিস্তিন’ ম্যাচ

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি ভয়াবহ হামলার কারণে গাজায় বসে ফুটবল উপভোগ করা এখন এক চরম বিলাসিতা। গাজার সাবেক ফুটবলার ও স্টেডিয়াম ম্যানেজার আদনান আল-আফিফি (৩৭) গাজার রূঢ় বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বিদ্যুৎ থাকলে তবেই মানুষ ম্যাচ দেখতে পারে। কিন্তু জ্বালানির তীব্র সংকট ও চড়া দামের কারণে বেশিরভাগ সময় জেনারেটরগুলো বন্ধ রাখতে হয়। সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রতি পদে পদে এর মূল্য চুকাতে হচ্ছে।”

গাজায় হারিয়ে যাওয়া ফুটবল উন্মাদনা ও শিশুদের মুখে হাসি কিছুটা ফিরিয়ে আনতে গাজা সিটির একমাত্র সচল ক্লাব ‘প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ক্লাব’-এ ফিলিস্তিন ও স্পেনের মধ্যে একটি প্রতীকী প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করেছিলেন আফিফি। এমনকি পেশাদার আন্তর্জাতিক ম্যাচের আবহ দিতে সেখানে স্থানীয় রেফারি এবং প্রতীকী ভিএআর (VAR) প্রযুক্তিরও চমৎকার ব্যবহার করা হয়।

স্পেনের রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও ক্রীড়াবিদদের সংহতি

গাজাবাসীর এই স্পেন-ভক্তির নেপথ্যে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক কারণও। ২০২৪ সালের মে মাসে স্প্যানিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি প্রদান করে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তার জোরালো আহ্বান জানানোর পাশাপাশি একে স্থায়ী দুই-রাষ্ট্র সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া ম্যানচেস্টার সিটির স্প্যানিশ কোচ পেপ গার্দিওলা এবং লামিনে ইয়ামালের মতো স্প্যানিশ ক্রীড়াব্যক্তিত্বদের প্রকাশ্য সংহতি গাজাবাসীর কাছে ফুটবলের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ধরা দিয়েছে।

গাজার পঙ্গু ফুটবল দল ‘গাজা আল-ইরাদা’র প্রধান কোচ হাতেম আল-মাগরিবি আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমার এই দলের খেলোয়াড়রা ইসরায়েলি বোমায় তাদের হাত-পা হারিয়েছেন, কিন্তু যারা আন্তর্জাতিক স্তরে ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাতে আমরা ভুলিনি। পুরো ফিলিস্তিনের মানুষ আজ মনে-প্রাণে চায় স্পেনই বিশ্বকাপ জিতুক।” বিশ্বকাপের সময় ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলায় মিসরের কিংবদন্তি কোচ হোসাম হাসানকেও ধন্যবাদ জানান তিনি।

“আর্জেন্টিনা আমাদের শত্রু নয়, তবে মিলাইয়ের নীতি পছন্দ নয়”

আফিফি জানান, চলমান যুদ্ধের কারণে রাফাহ থেকে বেইত হ্যানুন পর্যন্ত গাজার সমস্ত বড় বড় ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে অথবা বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। এখন কেবল ছোট ফাইভ-এ-সাইড (Five-a-side) পিচেই ফুটবল সীমাবদ্ধ। এতকিছুর পরও গাজাবাসীর কাছে ফুটবল হলো ৯০ মিনিটের জন্য যুদ্ধের বিভীষিকা ভুলে থাকার এক বিরল ও অন্যতম মাধ্যম।

আর্জেন্টিনার কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরাসরি ইসরায়েলকে নীতিগত সমর্থন দেওয়ায় ফিলিস্তিনিদের মাঝে তীব্র সমালোচনা হলেও আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই আফিফির। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি পরাশক্তি এবং প্রতিভার অনন্য স্কুল। স্পেনকে সমর্থনের অর্থ এই নয় যে আমরা আর্জেন্টিনার শত্রু। আমরা আলবিসেলেস্তেদের মাঠের ফুটবলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তাদের জন্যও আমাদের শুভকামনা রইল।”

ফাইনাল নিয়ে গাজার ভবিষ্যৎবাণী

আজকের হাইভোল্টেজ ফাইনাল নিয়ে গাজা আল-ইরাদার কোচ হাতেম আল-মাগরিবি বলেন, “লিওনেল মেসির জাদুকরী উপস্থিতির কারণে আর্জেন্টিনার জেতার সম্ভাবনা কাগজে-কলমে বেশি থাকতে পারে।” তবে আহমেদ আল-বোজমের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মতে, নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ গোলে সমতায় থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনাকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে স্পেনই উঁচিয়ে ধরবে ২০২৬ বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top