দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও মধ্যপ্রাচ্যের চরম যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে অবশেষে সুইজারল্যান্ডের মধ্যবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল বার্গেনস্টকে শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক। কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই বিশেষ বৈঠকটি আন্তর্জাতিক মহলে ‘লেক লুসার্ন সম্মেলন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
আজ রোববার (২১ জুন ২০২৬) শুরু হওয়া এই শীর্ষ বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ।
ইসলামাবাদ সমঝোতার প্রথম ধাপ ও ৪টি মূল এজেন্ডা
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মাত্র সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত গোপনে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী—আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষকে একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। সুইজারল্যান্ডের এই ‘লেক লুসার্ন সম্মেলন’ মূলত সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম বাস্তব ও কারিগরি ধাপ।
চলমান এই রুদ্ধদ্বার আলোচনার টেবিলে ৪টি মূল এজেন্ডা বা কাঠামো রয়েছে:
১. পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট সীমায় রাখা এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা।
২. নিষেধাজ্ঞা ও অবরুদ্ধ সম্পদ: ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ আর্থিক সম্পদ উন্মুক্ত করার আইনি ও প্রযুক্তিগত রূপরেখা।
৩. হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা: বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ (Horomuz Strait) দিয়ে সব দেশের বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
৪. লেবানন যুদ্ধবিরতি: মধ্যপ্রাচ্যকে বড় যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচাতে লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং ইসরায়েলের সাথে চলমান সংঘাতের একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা।
পর্দার আড়ালে হেভিওয়েটদের মহামিলন: কারা আছেন সম্মেলনস্থলে?
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের (TRT World) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সম্মেলনকে ঘিরে সুইজারল্যান্ডের ওই রিসোর্টে বিশ্বের একঝাঁক হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ঘটেছে।
-
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বহর: ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের প্রভাবশালী জামাতা ও সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এই আলোচনার অগ্রগতির জন্য সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন।
-
ইরানের প্রতিনিধি দল: স্পিকার গালিবাফের পাশাপাশি কারিগরি দরকষাকষির জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রতিনিধি দলে রয়েছেন।
-
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার: মধ্যস্থতায় মূল ভূমিকা পালনকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষে খোদ প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সুইজারল্যান্ডে উপস্থিত রয়েছেন। অপরদিকে, কাতারের পক্ষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক দল এই চতুর্মুখী বৈঠকে অংশ নিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ও ট্রাম্পের ৬০ দিনের আলটিমেটাম
আলোচনা টেবিল যতটাই জমজমাট হোক না কেন, মাঠের পরিস্থিতি এখনো বেশ জটিল ও ধোঁয়াশায় ভরা। লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রতিবাদে ইরান গত সপ্তাহে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ইরানের এই দাবিকে প্রোপাগান্ডা বলে নাকচ করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং মার্কিন নৌবাহিনী এর ওপর কড়া নজর রাখছে।
এদিকে, সুইজারল্যান্ডে বৈঠক চলাকালীনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগামী ৬০ দিনের ডেডলাইনের মধ্যে যদি ইরান কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে সই না করে বা চুক্তি ব্যর্থ হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ওই আন্তর্জাতিক নৌ-প্রণালীতে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর নিজস্ব ‘টোল’ বা শুল্ক আরোপ করতে পারে। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে লেক লুসার্ন সম্মেলনের শেষ পরিণতি কী হয়, তার ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি।







