দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের ছেলে ও জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে আটক করেছে পুলিশ। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর ও তাৎক্ষণিক নির্দেশে আজ রোববার (২১ জুন ২০২৬) দুপুরে রাজধানী ঢাকা থেকে তাকে যৌথভাবে হেফাজতে নেয় ডিবি ও জেলা পুলিশ।
এদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে খাইরুল ইসলাম সজীবকে সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি।
শিল্প গ্রুপের গাড়ি আটকে চাঁদা দাবি, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে অ্যাকশন
পুলিশ সদরদপ্তরের একটি বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যের ছেলে খাইরুল ইসলামকে আটকের পর প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কার্যালয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে বিকেল ৫টার দিকে তাকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেওয়া হলেও অধিকতর ও সংবেদনশীল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাতেই তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিন্টো রোডস্থ ডিবি কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্র জানায়:
গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কাঁচপুর ও সোনারগাঁ অঞ্চলের একটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে আসছিলেন খাইরুল। সম্প্রতি চাহিদামতো চাঁদার টাকা না দেওয়ায় ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্যবাহী গাড়ি আটকে রাখেন তিনি। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে পৌঁছালে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে গাড়িটি অবমুক্ত করা হয় এবং খাইরুলকে গ্রেফতারের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়।
এমপি বাবার প্রভাব খাটিয়ে কাঁচপুর-সোনারগাঁয়ে রাজত্ব
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও একাধিক শিল্পকারখানার মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, খাইরুলের বাবা আজহারুল ইসলাম সোনারগাঁ থানা বিএনপির সভাপতি এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য। বাবার এই সংসদীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে খাইরুল ইসলাম সজীব গত কয়েক মাস ধরে সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও কাঁচপুর শিল্প এলাকার বিভিন্ন মিল-কারখানার মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা ও চাঁদা তুলতেন।
টাকা না পেলে কারখানার পণ্যবাহী যানবাহন আটকে রাখা, কারখানা সচল করতে বাধা দেওয়া, কাঁচপুর বিসিক এলাকার ঝুট ব্যবসা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এবং জমি দখলের মতো ডজনখানেক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। তাঁর এই বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে কাঁচপুর ও সোনারগাঁ শিল্পাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা চরম ওষ্ঠাগত ও আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন।
ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ ও যুবদল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার
আজ বিকেলে খাইরুল ইসলাম আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটি তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক অ্যাকশন নেয়। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি (দপ্তরের দায়িত্বে) নুরুল ইসলাম সোহেল স্বাক্ষরিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং নানা অনিয়ম ও চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট ও সুষ্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে খাইরুল ইসলাম সজীবকে সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।” অন্যায়ের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবেই এই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আটক খাইরুলের বিরুদ্ধে দেশের বড় শিল্প গ্রুপসহ স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও কারখানার মালিকদের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির বেশ কিছু গুরুতর ও লিখিত অভিযোগ এসেছে। এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং ডিবি হেফাজতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশে খাইরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথমে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আনা হয়েছিল। তবে মামলা ও তদন্তের গভীরতার স্বার্থে পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে ডিএমপির ডিবি হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়েছে।







