ড. ফাতমা মেরিচ ইয়িলমাজ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বৈঠক
 

 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তুরস্ক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো সহায়তা চাইলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে তুরস্কসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের কার্যকর কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে উল্লেখ করে সংকট নিরসনে আঙ্কারাকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সোমবার (২২ জুন ২০২৬) ঢাকায় নিযুক্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের প্রেসিডেন্ট ড. ফাতমা মেরিচ ইয়িলমাজের (Dr. Fatma Meriç Yılmaz) সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

হাকান ফিদানের ঢাকা সফর ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল্যায়ন

বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ চলতি মাসের ৪ থেকে ৬ জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের (Hakan Fidan) সাম্প্রতিক সফল বাংলাদেশ সফরের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। সে সময় তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের মধ্যকার ফলপ্রসূ বৈঠকের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, “উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই যোগাযোগ আগামী দিনগুলোতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও মানবিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করবে।”

তিনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে (যেমন ওআইসি ও জাতিসংঘ) বৈশ্বিক ইস্যুতে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও পারস্পরিক সমর্থন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

১২ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা: একমাত্র সমাধান নিরাপদ প্রত্যাবাসন

বৈঠকে ওআইসির অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে তুরস্কের সামনে রোহিঙ্গা সংকটকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তুর্কি প্রতিনিধিদলকে ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন:

“২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলমান এই বিশাল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বাংলাদেশের স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরের পরিবেশগত ক্ষেত্রে এক অসহনীয় ও বিরাট চাপ তৈরি করেছে।”

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই মানবিক সংকটের একমাত্র ও চূড়ান্ত টেকসই সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে তাদের নিজেদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে (রাখাইন রাজ্য) প্রত্যাবর্তন। এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে ত্বরান্বিত করতে তুরস্ককে বৈশ্বিক ফোরামে আরও জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের অনুরোধ জানান তিনি।

বাংলাদেশের প্রশংসা ও তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের মানবিক অঙ্গীকার

বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে যে অসীম মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের প্রেসিডেন্ট ড. ফাতমা মেরিচ ইয়িলমাজ।

তিনি বৈঠকে আশ্বাস দিয়ে জানান, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট শুরু থেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে রয়েছে এবং বর্তমানেও ক্যাম্পে খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা, প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা এবং যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই বাস্তুচ্যুতি সংকট মোকাবিলায় তুরস্কের সরকার ও রেড ক্রিসেন্ট ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের পাশে থেকে আর্থিক ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নে তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের ধারাবাহিক কার্যক্রমের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং তুরস্কের সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সম্পূর্ণ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক মানবিক ইস্যুতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top