রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিল ও ব্রিফিং চলাকালে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। কর্তব্যরত গণমাধ্যমকর্মীদের ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ ও ‘স্বৈরাচারের দালাল’ আখ্যা দিয়ে জামায়াত নেতা-কর্মীদের একাংশ এই হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) সকালে ঘটে যাওয়া এই হামলায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘দৈনিক সকাল’-এর রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁকে উদ্ধার করে ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের মুখে দুঃখ প্রকাশ করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ভিডিও নিউজে ‘বাইট’ নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডা ও মারধর
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং উপস্থিত একাধিক সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাম্যান ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের ধানমন্ডি জোনের উদ্যোগে ফ্যাসিবাদবিরোধী এই বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল। মিছিল শেষে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের সামনে জামায়াত নেতারা উন্মুক্ত বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন।
হাজারীবাগ থানার জামায়াত আমির যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিও ক্যামেরাম্যান ও সাংবাদিকেরা তাঁদের অনুরোধ করেন, যেন সবাই সারিবদ্ধভাবে বক্তব্য না দিয়ে দলের পক্ষ থেকে মূল একজন প্রতিনিধি বা মুখপাত্র বক্তব্য (বাইট) দেন। কারণ, একাধিক ব্যক্তি একসঙ্গে হট্টগোল করে বক্তব্য দিলে টেলিভিশনের সংবাদের জন্য তা ধারণ বা প্রচার করা কারিগরিভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকদের এই পেশাগত অনুরোধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন উপস্থিত এক জামায়াত নেতা। তিনি সরাসরি বলেন, “আমরা সবাই বক্তব্য দেবো, আপনারা থাকলে থাকেন, না থাকলে নাই। আপনাদের আমাদের দরকার নাই।”
“সাংবাদিকরা তো আপনাদের কর্মী না”: বলতেই ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা
হামলার শিকার সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান শিশির নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে বলেন:
“ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জামায়াতের কর্মসূচিতে একাধিক বক্তা একসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। নিউজের স্বার্থে আমরা অনুরোধ করেছিলাম একজন মূল বক্তব্য তুলে ধরতে। জবাবে নেতারা বলেন, ‘কাভার না করলে চলে যান।’ আমি তখন এর প্রতিবাদ করে বলি—আপনারা সাংবাদিকদের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারেন না। আমরা তো সংবাদকর্মী, আপনাদের দলের কর্মী নই। আমার এই মন্তব্যটা উনারা সহ্য করতে পারেননি।”
শিশির আরও জানান:
“এই কথা বলার পরপরই একদল কর্মী এসে আমাকে ঘিরে ধরে এবং আমার আইডি কার্ড চেক করতে চায়। আমি পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করার আগেই তারা আমাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। প্রথম দফায় মারধরের পর আমি অন্য সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে, দ্বিতীয় দফায় আবার আমার ওপর চড়াও হয়ে হামলা করা হয়। পরে সহকর্মীরা আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নিয়ে যান।”
হামলাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ দাবি, ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর সংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ধানমন্ডি থানা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মুজিবুর রহমান খান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিষয়টিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে দাবি করেন। তিনি ডিফেন্স নিয়ে বলেন, “আমাদের এই শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বহিরাগত কেউ বা কোনো বিশেষ চক্র ঢুকে পড়ে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।”
এদিকে আজ দুপুরে এক সাংগঠনিক বিবৃতিতে ঘটনার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন। বিবৃতিতে বলা হয়:
“জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষায় বদ্ধপরিকর। ধানমন্ডিতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলার যে ঘটনা ঘটেছে, তার তদন্তে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ও ধানমন্ডি জোনের পরিচালক নুর নবী মানিকের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামীকালের (বুধবার, ২৪ জুন) মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। জামায়াতের কোনো জনশক্তি এর সাথে জড়িত থাকলে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি এটি কোনো ‘গুপ্তচরের’ কাজ কিনা তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
“গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ”: দুঃখ প্রকাশ কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকের
একই ঘটনায় গভীর দুঃখ ও দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সর্বদা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং যেকোনো গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ বিনির্মাণে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর যেকোনো ধরনের চড়াও হওয়া বা সহিংসতা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আজকের অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।”







