প্রকাশ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা বা থমথমে ভাব পরিলক্ষিত হলেও, পর্দার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে চলছে এক নজিরবিহীন ও তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা। একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি (Interim Agreement) চূড়ান্ত সইয়ের লক্ষ্য নিয়ে সুইজারল্যান্ডের একটি অত্যন্ত নিভৃত ও নিরিবিলি রিসোর্টে জড়ো হয়েছেন বিশ্বের একাধিক প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক ও শীর্ষ কূটনীতিবিদ। সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ গোপনে এই রুদ্ধদ্বার আলোচনা চলছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই স্পর্শকাতর চুক্তির শতভাগ গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে উভয় পক্ষই সুইজারল্যান্ডকে তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির মূল স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
নেপথ্যে যাঁরা আছেন: রিসোর্টে বিশ্বনেতাদের আনাগোনা
আলোচনাটি যে চরম কৌশলগত এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের, তা প্রমাণ করে রিসোর্টটিতে উপস্থিত থাকা একের পর এক ‘হেভিওয়েট’ ব্যক্তিত্বের তালিকা:
-
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাই-প্রোফাইল প্রতিনিধি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে যুক্ত হয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের সাবেক শীর্ষ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। সুইজারল্যান্ডের ওই রিসোর্টে তাঁকে সশরীরে দেখা গেছে বলে একজন প্রত্যক্ষদর্শী নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া মার্কিন ধনকুবের ব্যবসায়ী ও বিশেষ কূটনীতিবিদ স্টিভ উইটকফ ইতিমধ্যেই সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর রয়েছে।
-
মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় কাতার: মধ্যপ্রাচ্যের প্রধানতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের প্রধানমন্ত্রী গত ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই নির্দিষ্ট রিসোর্টেই অবস্থান করছেন। তিনি চুক্তির জট খুলতে একের পর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন এবং এর মাঝেই সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল বৈঠক সম্পন্ন করেছেন।
‘কোয়াড’ জোট ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণ
এই ঐতিহাসিক চুক্তির পথ সুগম করতে গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোমেসি বা আড়ালের কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে চার দেশের একটি বিশেষ জোট, যা কূটনৈতিক মহলে ‘কোয়াড’ (তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর ও কাতার) নামে পরিচিতি পেয়েছে।
এই অঞ্চলের বর্তমান তৎপরতা নিম্নরূপ:
কায়রোতে কোয়াড বৈঠক: এই কোয়াড জোটের শীর্ষ প্রতিনিধিরা বর্তমানে মিশরের কায়রোতে অবস্থান করে চুক্তির পরবর্তী আন্তর্জাতিক রোডম্যাপ ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।
পাকিস্তানের সক্রিয় অংশগ্রহণ: পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কায়রোতে গিয়ে এই কোয়াড প্রতিনিধিদের সাথে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। অন্যদিকে, সমান্তরাল কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খোদ তেহরানে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটি অতি স্পর্শকাতর ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সম্পন্ন করেছেন।
প্রকাশ্যে থমথমে, আড়ালে ‘হার্ড অ্যান্ড ফাস্ট’ দরকষাকষি
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যে ধরনের প্রথাগত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার কথা ছিল, তা সামনে স্থবির বা থমকে গেছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো।
চুক্তির শেষ মুহূর্তের অত্যন্ত জটিল শর্তসমূহ, বিশেষ করে নিরাপত্তা গ্যারান্টি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত সমুদ্রসীমা সচল রাখার শেষ মুহূর্তের দফারফা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ‘হার্ড অ্যান্ড ফাস্ট’ (তীব্র গতিতে) চূড়ান্ত দরকষাকষি চলছে। ওয়াশিংটন, তেহরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী ও জটিল কূটনৈতিক সমীকরণের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে শেষ পর্যন্ত কী ঘোষণা আসে, এখন সেদিকেই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।







