ভারতে আজান-নামাজ নিয়ে মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে- ওয়াইসি
 

 

আজান-নামাজ নিয়ে মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে, দ্বিতীয় কোনো হিজরত হবে না: আসাদউদ্দিন ওয়াইসি

ভারতে নামাজ, আজান এবং ধর্মীয় উৎসবের মতো বিষয়গুলো উত্থাপন করে মুসলিম সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিশানা করার প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) সভাপতি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। সম্প্রতি একটি ঈদ মিলাপ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওয়াইসি জোর দিয়ে বলেন যে, চারপাশ থেকে যতই বিরোধিতা আসুক না কেন, মুসলিম সম্প্রদায় কোনো অবস্থাতেই তাদের নামাজ ও ধর্মীয় রীতিনীতি ত্যাগ করবে না।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের জনশৃঙ্খলার স্বার্থে নামাজ নিয়ন্ত্রণের আহ্বানের পর হায়দরাবাদের এই সংসদ সদস্যের এমন কড়া প্রতিক্রিয়া এলো।

আজান-নামাজ বিতর্ক ও ঐতিহাসিক অবদানের স্মরণ

ওয়াইসি ক্ষোভ প্রকাশ করে উল্লেখ করেন যে, দেশে ঈদুল আজহা বা রমজানের মতো বড় ধর্মীয় উৎসবগুলো ঘনিয়ে আসলেই আজান ও নামাজ নিয়ে একশ্রেণীর মহলে বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “আজান নিয়ে সমস্যা, নামাজ নিয়ে সমস্যা — আপনাদের লোকেদের আসলে কী হয়েছে?”

বক্তব্য চলাকালীন তিনি আল্লামা ফজল-ই-হক খায়রাবাদীর মতো অবিভক্ত ভারতের প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলারদের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ওয়াইসি বলেন, “যাঁরা মসজিদ থেকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করেছিলেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁরাও মুসলিম ছিলেন।” এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আড়াল করে বর্তমান সময়ে মুসলিমদের তাদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে জ্ঞান দেওয়ার প্রচেষ্টার সাথে তিনি তীব্র তুলনা করেন।

রাস্তায় নামাজ ও ধর্মীয় শোভাযাত্রা নিয়ে দ্বিমুখী নীতি

ভারতের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক দ্বিমুখী নীতির বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, “উত্তরাখণ্ড থেকে রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যে অন্য ধর্মের উৎসবের সময় ধর্মীয় যাত্রা এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার জন্য প্রায়শই কোনো ধরনের আপত্তি ছাড়াই মাইলের পর মাইল রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, রাস্তায় নামাজ কেবল জুমার দিন (শুক্রবার) কিংবা ঈদের সময় সাময়িকভাবে হয়, প্রতিদিন বা ২৪ ঘণ্টা নয়। ভারতে সব ধর্মের উৎসবের সময়ই মানুষের ঢল রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে উল্লেখ করে তিনি সমালোচকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “সেগুলোর সময় আপনারা সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান, শুধু মুসলিমদের বেলাতেই আপনাদের আপত্তি জাগে।”

সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ ও মাংস বিক্রির নিষেধাজ্ঞা

হায়দরাবাদের এই প্রভাবশালী সাংসদ ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের (Article 25) কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, যা দেশের প্রত্যেক নাগরিককে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। তিনি এই সাংবিধানিক অধিকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জোর দাবি জানান।

হিন্দু উৎসবগুলোর সময় বিভিন্ন রাজ্যে জোরপূর্বক মাংস বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনি যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সরকারকে একটি চতুর পরামর্শ দেন। ওয়াইসি বলেন, “এই পবিত্রতার যুক্তি যদি অভিন্নভাবে সবার ওপর প্রয়োগ করতেই হয়, তবে পবিত্র রমজান মাসের সম্মানার্থে দেশজুড়ে মদের দোকানগুলোও সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা উচিত।” তিনি অভিযোগ করেন, একশ্রেণীর সমালোচক ও রাজনৈতিক দল মূলত মুসলিমদের ভারতের বুকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে’ পরিণত করার উদ্দেশ্যে সমাজজুড়ে অনবরত ঘৃণা ছড়াচ্ছে।

‘দ্বিতীয় কোনো দেশত্যাগ বা হিজরত হবে না’

তুর্কমেন গেট, হাশিমপুরা এবং আসামের নেলীসহ অতীতের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার রক্তাক্ত প্রসঙ্গ টেনে এআইএমআইএম প্রধান দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন:

“কেউ এ দেশ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে না; ভারতের মাটিতে মুসলিমদের দ্বিতীয় কোনো দেশত্যাগ বা হিজরত হবে না।”

এই দেশ সবার— এমন মন্তব্য করে তিনি বর্তমান বিজেপি সরকারকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সতর্ক করেন। একই সাথে তিনি দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যেখানে দেশজুড়ে ২২ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া ‘নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস’ এবং জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে সাধারণ মানুষ সংকটে আছে, সেখানে মিডিয়া সেই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়াল করে সারাদিন আজান আর মাংসের মতো সাপ্রদায়িক ইস্যুতে মনোযোগ ধরে রাখছে।

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার আহ্বান জানান। ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়— সেই ধ্রুব সত্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওয়াইসি বলেন, অতীতের প্রতাপশালী শাসকদের বড় বড় রাজপ্রাসাদগুলো আজ ইতিহাসের পাতায় জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে, বর্তমান শাসকদেরও এটি ভুলে যাওয়া উচিত হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top