নির্বাচিত নতুন বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের হঠাত পদত্যাগকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ও ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। দীপেন দেওয়ান ঠিক কী কারণে এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা উদঘাটন করার চেষ্টা করছেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মী এবং পাহাড়ের সচেতন মহল।
এদিকে, পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও তাঁকে সপদে পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন তাঁর অনুসারীরা। বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় নেতাদের একাংশের দাবি— কোনো একটি বিশেষ মহলের তীব্র চাপ প্রয়োগের কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দীপেন দেওয়ান। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্রে তিনি ব্যক্তিগত ‘শারীরিক জটিলতা ও অসুস্থতার’ কথা উল্লেখ করেছেন।
রেকর্ড ভোটে জয়ী থেকে মন্ত্রিত্ব, তারপর আকস্মিক বিদায়
যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসা দীপেন দেওয়ান এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুরো দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। বিএনপি সরকার গঠন করলে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার রক্ষায় দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, তাঁর বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা।
বর্তমানে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, দীপেন দেওয়ানের এই পদত্যাগের বিষয়টি তাঁরা আগে থেকে বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেননি। রাজনৈতিক মহলের ধারণা— পাহাড়ের তিন জেলাকেন্দ্রিক মন্ত্রণালয় পরিচালনা, রাঙামাটির স্থানীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলোতে নতুন প্রশাসক নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে তিনি পদত্যাগ করে থাকতে পারেন। তবে এ ব্যাপারে দীপেন দেওয়ানের কোনো প্রত্যক্ষ বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিন জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ ও পাহাড়ের তিন এমপি
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম মূলত রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান— এই তিন জেলাকেন্দ্রিক। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই তিনটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। বান্দরবান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সাচিংপ্রু জেরি এবং খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য হিসেবে আছেন প্রভাবশালী নেতা ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রবীণ নেতা জানিয়েছেন, অতীতে পাহাড়ের এমপিদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ থাকলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল এবং তাঁদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। দীপেন দেওয়ান মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর পাহাড়ের সংবেদনশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সর্বস্তরের জনপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থার সংকট দূর করার কাজ শুরু করেছিলেন।
খাগড়াছড়ি সফর ও ওয়াদুদ ভূঁইয়ার অবস্থান:
গত ১১ মে খাগড়াছড়ি জেলা সফরে গিয়ে সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন দীপেন দেওয়ান। তবে ওই গুরুত্বপূর্ণ সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন না। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর যোগাযোগ করা হলে ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানান, পদত্যাগের আসল কারণ তাঁর জানা নেই। সেদিন অসুস্থতার কারণে তিনি সভায় থাকতে পারেননি এবং দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতাদের ক্ষোভ
স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে রাঙামাটি জেলা বিএনপিতে যে বিভক্তি ছিল, তা এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে এক পক্ষে আছেন পদত্যাগী মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের অনুসারীরা এবং অন্য পক্ষে আছেন জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের অনুসারীরা। অবশ্য দলীয় বিরোধের বিষয়টি অস্বীকার করে দীপন তালুকদার জানিয়েছেন, মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে তিনি আগে থেকে কোনো ইঙ্গিত পাননি এবং এটি একান্তই দীপেন দেওয়ানের ব্যক্তিগত বিষয়।
তবে পদত্যাগের পেছনে ‘অসুস্থতার’ কারণ মানতে নারাজ মাঠপর্যায়ের নেতারা। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো বলেন:
“দীপেন দেওয়ান শারীরিকভাবে মোটেও অসুস্থ নন। দীর্ঘ দিন প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর সঙ্গে ঘুরেছি, কখনো তাঁকে দুর্বল দেখিনি। বিএনপির কিছু নেতা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন। তাঁর এই পদত্যাগ পাহাড়ে সকল সম্প্রদায়ের ‘রংধনু জাতি’ গঠনের জন্য এবং বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত ও ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রভূত ক্ষতি করবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাই, যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রণালয়ে ফেরত দিন।”
একই সুর শোনা গেছে কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাজামং মারমার কণ্ঠেও। তিনি দাবি করেন, গত ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে যারা গোপনে লালন-পালন করছিল, তাদের নানামুখী চাপের মুখে পড়েই দীপেন দেওয়ান সাময়িকভাবে এই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আইনি বাধ্যবাধকতা
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়টির গঠন ও পরিচালনার পেছনে একটি ঐতিহাসিক আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে:
-
প্রতিষ্ঠা: ১৯৯৭ সালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির শর্তানুসারে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই এই মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে।
-
আইনি ধারা: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ নম্বর ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে— ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’
বর্তমান সংসদের পাহাড়ের তিন এমপির মধ্যে দুজন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর (দীপেন দেওয়ান ও সাচিংপ্রু জেরি) এবং একজন বাঙালি (ওয়াদুদ ভূঁইয়া)। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র চূড়ান্তভাবে গৃহীত হলে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বের জন্য বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরি কিংবা পাহাড়ের অন্য কোনো যোগ্য উপজাতীয় নেতৃত্বকে বেছে নিতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে।







