মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন এবং তাঁর সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা অবশেষে কাটতে শুরু করেছে। মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) গত শুক্রবার থেকে ৩ মিলিয়নেরও বেশি পৃষ্ঠা সম্বলিত নথিপত্র, হাজার হাজার ভিডিও এবং প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি প্রকাশ শুরু করেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে পাস হওয়া ‘এপস্টেইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর অধীনে এই ব্যাপক তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামলে এই নথিপত্রগুলো প্রকাশ্যে আসায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশাল নথিতে এমন সব প্রভাবশালী নাম উঠে এসেছে যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ব্যবসায়িক অঙ্গনকে সজোরে ধাক্কা দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে নিয়ে। নতুন প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে ক্লিনটন এক তরুণীর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটাচ্ছেন, যাঁকে যৌন নিপীড়নের শিকার হিসেবে বর্ণনা করেছে এফবিআই। এছাড়া তাঁর কর্মীদের সঙ্গে এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েলের ঘনঘন যোগাযোগের প্রমাণ ই-মেইলে পাওয়া গেছে। এমনকি রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ইতিমধ্যেই বিল ও হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ‘অবমাননার প্রস্তাব’ আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কারণ তাঁরা এই তদন্তে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের নামও এই নথিতে শত শত বার এসেছে, যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে আনা পুরনো কিছু অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন এবং এপস্টেইনের পাঠানো জন্মদিনের বার্তার উল্লেখ রয়েছে।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য এই ফাইলগুলো রীতিমতো এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু (মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর) এক অজ্ঞাতনামা নারীর ওপর হামাগুড়ি দেওয়া অবস্থায় হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন। এছাড়া এপস্টেইনের সঙ্গে অ্যান্ড্রুর বিনিময় করা ই-মেইলগুলোতে বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ এবং এক ২৬ বছর বয়সী রাশিয়ান তরুণীর সঙ্গে আলাপের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই ফাঁসের জেরে যুক্তরাজ্যে আবারও অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার দাবি জোরালো হচ্ছে। রাজপরিবারের এই ঘনিষ্ঠতা প্রমাণ করছে যে, এপস্টেইনের অপরাধচক্র কতটা গভীরে ছড়িয়ে ছিল।
ব্যবসায়িক বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরাও বাদ পড়েননি এই তালিকা থেকে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, জনৈক রুশ তরুণীর সঙ্গে সম্পর্কের জের ধরে বিল গেটসের জন্য বিশেষ ওষুধ সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এলন মাস্ক, সের্গেই ব্রিন এবং নোয়াম চমস্কির মতো ব্যক্তিদের নামও বিভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে। এমনকি লেবার পার্টির সাবেক মন্ত্রী লর্ড মেন্ডেলসন এই নথির জেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। নথিপত্রগুলোতে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এপস্টেইন কেবল নিজে অপরাধ করেননি, বরং হার্ভে ওয়াইনস্টিনের মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের কাছে ভুক্তভোগী নারীদের ‘উপহার’ হিসেবে পাঠাতেন। ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা বলছেন, এই নথিপত্রগুলো প্রমাণ করে যে এটি কেবল এপস্টেইনের একক অপরাধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট যা উচ্চবিত্তদের বিকৃত আনন্দ দিতে ব্যবহৃত হতো।







