চলমান এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে উপর্যুপরি মারাত্মক ত্রুটি, বৈষম্যমূলক পরীক্ষা পদ্ধতি এবং শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা বিএনএস সেন্টার এলাকা অবরোধ করে দিনভর বিক্ষোভ করেছেন এইচএসসি ২০২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ চরম সমন্বয়হীনতার কারণে দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, যার ফলে রাজধানীজুড়ে এক নজিরবিহীন ও চরমতম মানবিক জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) সকাল ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধ চলে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাসের পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে আন্দোলনকারীরা সড়ক ছেড়ে দিলে ট্রাফিক পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় মহাসড়কে যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
“মিলন তুই গদি ছাড়”: রণক্ষেত্রে পরিণত উত্তরা
সকাল ১১টার দিকে উত্তরা ও আশপাশের বিভিন্ন কলেজের হাজার হাজার এইচএসসি পরীক্ষার্থী আকস্মিকভাবে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় তারা “এক দুই তিন চার মিলন তুই গদি ছাড়”, “শিক্ষা নিয়ে ষড়যন্ত্র চলবে না চলবে না” ইত্যাদি তীব্র স্লোগানে পুরো উত্তরা এলাকা মুখরিত করে তোলেন।
আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, তারা কোনো ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে চান না, বরং একটি মানবিক ও শিক্ষার্থী-বান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই প্রতীকী কর্মসূচি। তবে তাদের দাবি পূরণে সরকারকে ১ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় যে, নির্দিষ্ট সময়ে দাবি না মানলে দিনব্যাপী পুরো মহাসড়ক অবরোধ করা হবে।
শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৮ দফা দাবি
বিক্ষোভের মুখে শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে তাদের ৮ দফা দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো:
১. দায় স্বীকার: শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রশ্নপত্রের ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।
২. গবেষণা বন্ধ: এইচএসসি ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ল্যাবরেটরির মতো কোনো প্রকার বিতর্কিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা নতুন পদ্ধতির গবেষণা চালানো বন্ধ করতে হবে।
৩. পরীক্ষা স্থগিত: দেশজুড়ে বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা নেওয়ার মতো অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত চলমান পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে।
৪. ভুলের জন্য ক্ষমা: পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে মারাত্মক ভুলের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশ্নকর্তা ও শিক্ষা বোর্ডকে ক্ষমা চাইতে হবে।
৫. ক্ষতিপূরণ: প্রশ্নপত্রে ত্রুটির কারণে বিজ্ঞান বিভাগের সকল বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক ১৪ নম্বর (ক্ষতিপূরণমূলক) প্রদান করতে হবে।
৬. শিক্ষার্থী-বান্ধব ব্যবস্থা: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবশ্যই পরীক্ষার্থীবান্ধব ও চাপমুক্ত করতে হবে।
৭. মান উন্নয়ন: গত দুই বছরের সিলেবাস ও প্রস্তুতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রশ্নপত্রের গুণগত মান উন্নয়ন করতে হবে।
৮. প্রাথমিক গুরুত্ব: সরকারকেও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রধান এবং মূল দাবিই ছিল বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ।
শিক্ষার্থীদের সমন্বয়হীনতা ও রাজপথে চরম নাটকীয়তা
দুপুরের পর আন্দোলনস্থলে এক চরম নাটকীয় ও সমন্বয়হীন চিত্র দেখা যায়। দুপুর ৩টার দিকে আন্দোলনের একাংশের নেতৃবৃন্দ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে দফায় দফায় আলোচনা শেষে জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে বিকেল ৩:৩০ মিনিটের মধ্যে বিএনএস সেন্টার এলাকা ত্যাগ করার ঘোষণা দেন। তারা আল্টিমেটাম দেন যে, চলমান পরীক্ষার পর যদি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসে, তবে তারা ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে সমন্বয় করে দেশব্যাপী ‘অসহযোগ আন্দোলনের’ মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
নেতৃবৃন্দের এই ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় আটকে থাকা অবরুদ্ধ হাজার হাজার গাড়ি চালক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দেন। কিন্তু গাড়ি চলতে শুরু করার মাত্র কয়েক মিনিট পরই শিক্ষার্থীদের আরেকটি বিশাল উগ্র গ্রুপ সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে চলন্ত গাড়ির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। শুরু হয় দুই গ্রুপের মধ্যে চরম চিৎকার, চেঁচামেচি ও ধস্তাধস্তি। ফলে কয়েক মিনিটের স্বস্তি নিমেষেই উবে যায় এবং দ্বিতীয় দফায় সড়কটি সম্পূর্ণ ব্লক হয়ে পড়ে।
৮ ঘণ্টার স্তব্ধতা: চালকদের ঘুম, অসুস্থদের ছটফটানি
টানা ৮ ঘণ্টার এই অনড় অবরোধের ফলে ঢাকা প্রবেশ ও ঢাকা থেকে বের হওয়ার উভয় দিকের লেনে কয়েক হাজার যানবাহন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড গরমে বাসের ভেতর আটকে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে হাজার হাজার যাত্রী গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পড়েন দূরপাল্লার চালক, বৃদ্ধ, নারী ও অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে বসে থেকে ক্লান্তিতে অনেক চালককে ড্রাইভ সিটেই ঘুমিয়ে পড়তে দেখা যায়। তীব্র গরমে অনেক অসুস্থ মানুষকে গাড়ির ভেতরেই ছটফট করতে দেখা যায়, যা সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষকেও ব্যথিত করে তোলে।
সন্ধ্যায় আশ্বাসে ঘরে ফেরা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উত্তরা জোনের পুলিশ প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা দিনভর দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের সাথে সমঝোতা বৈঠক করেন। সব শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ ও স্থগিত পরীক্ষার নতুন সিদ্ধান্তের খবর পৌঁছালে এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের জোরালো আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিয়ে বাসায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের যৌথ সহযোগিতায় ধীরে ধীরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরার অংশে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।







