বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে- চীনা রাষ্ট্রদূত
 

 

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে: চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন

“বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে কূটনৈতিক ও কৌশলগত ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং শক্তিশালী পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সফর দুই দেশের এই অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। উন্নয়ন, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা দিতে বেইজিং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সমিতি’ আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে সম্মানিত বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এসব কথা বলেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মুক্ত বাণিজ্য, দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানসহ দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার এক বিস্তৃত ও দূরদর্শী রূপরেখা তুলে ধরেন।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় পূর্ণ আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা

উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সাথে জড়িত তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনায় চীনের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন:

“তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে এই মেগা প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (Feasibility Study) কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উন্নত কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিতে বেইজিং পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং সামগ্রিক পরিবেশে এক বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”

আমের পর এবার চীনের বিশাল বাজারে যাচ্ছে বাংলাদেশের তাজা কাঁঠাল

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য বড় সুখবর দিয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশের তাজা কাঁঠাল চীনে রপ্তানির জন্য বেইজিং তাদের বিশাল বাজার উন্মুক্ত করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফল চীন সফরে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে পূর্বের আমের সফল রপ্তানির পর এবার বাংলাদেশের তাজা কাঁঠালও চীনের বিশাল ভোক্তা বাজারে সরাসরি প্রবেশের আইনি ও বাণিজ্যিক সুযোগ পেল, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বুলেট ট্রেন ও অর্থনৈতিক করিডোর

যোগাযোগ খাতের যুগান্তকারী উন্নয়ন ও আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি নিয়ে ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিএমইসি / BCMEC) প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।

পাশাপাশি, চীনের বিশ্বখ্যাত উচ্চগতির রেল প্রযুক্তি (High-Speed Rail Technology) বাংলাদেশে ব্যবহারের সম্ভাবনাকে বেইজিং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম রুটগুলোতে দ্রুতগতির ‘বুলেট ট্রেন’ চালুর এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে।

মিয়ানমারের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রোহিঙ্গা মধ্যস্থতা

দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন:

“বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তিত ও জটিল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ এগিয়ে নিতে এবং একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে চীন তার সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ও ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রাখবে।”

সেমিনারে সমাপনী বক্তব্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরে চীনের ধারাবাহিক সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং দুই দেশের মৈত্রী আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা এবং বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সমিতির শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top