গণভোট না মানলে এই সরকারও মানা হবে না- ডা. শফিকুর রহমান
 

 

“গণভোট না মানলে এই সরকারও মানা হবে না, ২৪-এর মতো বক্ষে আগুন লাগাবেন না”: বরিশালে ডা. শফিকুর রহমান

“যে ঐতিহাসিক গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ রায় দিয়েছে, সেই একই দিনে একই মেকানিজমের ভোটে আপনারা আজ নিজেদের সরকার বলে দাবি করছেন। অথচ ক্ষমতায় এসে আপনারা সেই গণভোটের রায়কেই ভুলে গেলেন! আমাদের সাফ কথা—জনগণের দেওয়া সেই পবিত্র গণভোটের রায় যদি আপনারা বাস্তবায়ন না করেন, তবে এই সরকারকেও মানা হবে না। জনতার গণভোট ব্যর্থ হলে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। ওই গণরায় মানতে জনগণ আপনাদের বাধ্য করবে ইনশাআল্লাহ।”

আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) বিকেলে বরিশাল নগরীর ঐতিহ্যবাহী হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের এক বিশাল ও স্মরণকালের সর্ববৃহৎ বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে এসব কড়া হুঁশিয়ারি দেন।

গণভোটের গণরায় দ্রুত কার্যকর, চরম জনদুর্ভোগ নিরসন, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভাঙাচোরা যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবহেলিত ও বঞ্চিত দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের দাবিতে ১১ দলীয় জোট এই বিভাগীয় সমাবেশের আয়োজন করে।

বিএনপিকে হুঁশিয়ারি: “রাজপথ জ্বলে উঠলে আগুনে অনেক কিছু ছারখার হবে”

জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহ-সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াজ্জম হোসাইন হেলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মহাসমাবেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে জামায়াত আমির বলেন:

“আপনারা ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে বোঝেননি যে কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) সরকার কাকে বলে। শেষ পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলনের মুখে বুঝেছিলেন ঠিকই। আমরা এবারও বলব—জাতির বড় কোনো ক্ষতি করে ভুল বুঝবেন না, এখনই সময় থাকতে বুঝুন। আমরা রাজপথে এভাবে সংঘাতের দিকে যেতে চাই না। আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে চাই। কিন্তু আপনারা আমাদের জোর করে রাজপথের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। মনে রাখবেন, রাজপথ যদি আবার নতুন করে জ্বলে ওঠে, তবে সেই আগুনে অনেক কিছু পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।”

ডা. শফিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ফ্যাসিবাদ যে স্বৈরাচারী ও অহংকারী পথে হেঁটেছিল, আপনারা আজ অবিকল সেই পথেই হাঁটছেন। দেশের বীর জনগণ যেখানে আসল ফ্যাসিবাদকেই কোনো পাত্তা দেয় নাই, সেখানে আপনারা তো আসলে ফ্যাসিবাদের ধারেকাছেও যেতে পারবেন না। আপনারা জনগণের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের স্লোগানের মতো মানুষের বক্ষে নতুন করে আগুন লাগাবেন না। এ দেশে ১৯৭১-এর মর্যাদাও থাকবে, আবার ২০২৪-এর বীর শহীদদেরও সমান রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে হবে।”

“ভাঙ্গার পরেই শুরু ভাঙ্গা রাস্তা”: দক্ষিণাঞ্চলের বঞ্চনা নিয়ে ক্ষোভ

সুনির্দিষ্টভাবে বরিশাল ও অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের বেহাল দশা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সরকার গঠনের আগে আপনারা ৩১ দফায় বলেছিলেন যে ক্ষমতায় গেলে সারা দেশের সুষম উন্নয়ন করবেন। কিন্তু বরিশাল বিভাগকে চরমভাবে বঞ্চিত রেখে সুষম উন্নয়ন কোনোদিন সম্ভব নয়। ঢাকা থেকে চমৎকার সড়ক পথে ভাঙ্গা পর্যন্ত এসে যখন আমি বরিশালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম, তখন স্বচক্ষে দেখলাম—ভাঙ্গার পরেই মূলত আসল ‘ভাঙ্গা রাস্তা’ শুরু হয়েছে! একটি বিভাগীয় মহাসড়কের দুই লেনের রাস্তা, তাও আবার বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো ঢেউ খেলানো।”

দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে তিনি ৩টি প্রধান দাবি পেশ করেন:

১. ছয় লেনের মহাসড়ক: ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে অতি দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে ছয় লেনে উন্নীত করতে হবে।

২. ভোলা-বরিশাল সেতু: ভোলা বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, অথচ তাকে সবদিক থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। ভোলা ব্রিজ নির্মাণ ভোলাবাসীর প্রতি কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি তাদের ন্যায্য ও আইনি দাবি। একনেকে (ECNEC) কেন এখনো ভোলা ব্রিজের প্রকল্প উঠানো হয়নি, সরকার তা স্পষ্ট করুক।

৩. বরিশালে রেললাইন: বরিশালবাসী শুধু যুগের পর যুগ রেললাইনের গল্পই শুনেছেন, কখনো চোখে দেখেননি। বরিশালকে বঞ্চিত রাখা আর সহ্য করা হবে না, এখানে অবিলম্বে রেললাইনের কাজ শুরু করতে হবে।

দ্রব্যমূল্য ও ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কটাক্ষ

বাজার পরিস্থিতি ও সরকারের সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়ে আপনারা এখন সাধারণ মানুষকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এই কার্ড দিয়ে মানুষ কীভাবে বাঁচবে? কারণ ফ্যামিলি কার্ডে আপনারা দিচ্ছেন আড়াই হাজার টাকা, আর বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়িয়ে রেখেছেন পাঁচ হাজার টাকা! এগুলো গোঁজামিল।”

তিনি বর্তমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে বিএনপিকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, দেশকে সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের দিকে না নিয়ে সরকারের উচিত অবিলম্বে জাতীয় সংসদে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর বিশেষ অধিবেশন ডাকা, সকলের শপথ গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় কার্যকর করা।

“আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে”: কর্নেল অলি

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন:

“ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের এ দেশের মাটিতে রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে। এই খুনি আওয়ামী লীগ আর কোনোদিন বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারবে না। একটি মহান আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে আমরা ১১টি দল আজ একজোট হয়েছি। আমরা যেকোনো মূল্যে দেশ থেকে সব ধরনের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি ও অবৈধ দখলবাজি বন্ধ করতে চাই।”

প্রতিবেশী দেশ ভারতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “ভারতে প্রতিনিয়ত ঐতিহাসিক মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মুসলমানদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত উসকানিমূলক কথাবার্তা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমরা তাদের কোনো ফাঁদে পা দেব না। আমরা আল্লাহর পবিত্র কোরআন মেনে চলি, তাই অন্য ধর্ম বা মানুষের ক্ষতি করা আমরা কখনো বরদাশত করব না।”

“গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশের মানুষকে ভয় দেখানো যাবে না”: ব্যারিস্টার ফুয়াদ

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, “আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা বর্তমান সরকারের জন্যই মারাত্মক আত্মঘাতী ও ক্ষতিকর হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের এক ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।” তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ভারতে বসে বিদেশি গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশের মানুষকে ভয় দেখানো বা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। দেশে ফিরলে তাঁকে অবশ্যই জুলাই গণহত্যার জন্য আদালতের মুখোমুখি হতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং বরিশাল বিভাগের উন্নয়নে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো মানুষের ঢল

আজ সকাল থেকেই বরিশালে থেমে থেমে প্রচণ্ড বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে বরিশাল মহানগর, সদর উপজেলাসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হন। দুপুর ২টায় সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টা থেকেই কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্য শুরু হয়ে যায়। জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সৈয়দ আহমেদের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দুপুরের মধ্যেই পুরো ঈদগাহ ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে জনস্রোত চারপাশের মূল সড়কগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। সমাবেশটিতে আনুমানিক লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে।

সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন— জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁনসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top