বিদেশে থাকায় চকরিয়ায় আসতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
 

 

“ভোঁত গঁরি চাইলুম, আঁরা হঁত দূরত আছিলুম কিন্তু হরা দিলত আঁরা চঁরিয়াবাসীর লগেই আছিলুম”: কক্সবাজারে ত্রাণ বিতরণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

“বিএনপি সব সময়ই দেশের আপামর জনসাধারণের দল এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার যেকোনো দুর্যোগে সর্বদা সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে।”

আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) বিকেলে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত দুর্গত এলাকায় সরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে এই মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

একই সাথে নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষ যখন বন্যার ভয়াবহ প্রকোপে ধুঁকছিল, তখন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সফরে দেশের বাইরে থাকায় মানুষের পাশে সময়মতো এসে দাঁড়াতে না পারার জন্য চকরিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় (চাটগাঁইয়া উপভাষায়) আবেগঘন কণ্ঠে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। নিজ এলাকার মানুষের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন:

“আঁই তৌফিক ন পাইয়ুম হঁনতে, বিদেসত আছিলুম বুলি সময়ত চঁরিয়াবাসীর হাছে আইত ন পাইয়ুম। ভোঁত গঁরি চাইলুম, আঁরা হঁত দূরত আছিলুম কিন্তু হরা দিলত আঁরা চঁরিয়াবাসীর লগেই আছিলুম। অহন আইসি, আঁরার সরকার তোঁয়ারার হষ্ট দূর ন গঁরা ফয্যন্ত লগে থাহিবো।” (আমি তৌফিক পাইনি, বিদেশে থাকার কারণে সময়মতো চকরিয়াবাসীর কাছে আসতে পারিনি। গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, আমরা যতই দূরে থাকি না কেন, আমাদের পুরো মনটা চকরিয়াবাসীর সাথেই ছিল। এখন এসেছি, আমাদের সরকার তোমাদের কষ্ট দূর না হওয়া পর্যন্ত পাশেই থাকবে।)

“ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন জরিপ চলছে”

চলমান বন্যা পরিস্থিতি ও সরকারি উদ্যোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সব ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক প্রস্তুতি রয়েছে। বন্যাদুর্গত মানুষের তাৎক্ষণিক ক্ষুধা ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত ত্রাণ তৎপরতা পুরোদমে অব্যাহত রাখা হয়েছে।”

ক্ষতিগ্রস্ত অবকাটামো ও কৃষকদের সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রী চকরিয়াবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন:

“দেশের যেসব জেলা ও উপজেলা বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব এলাকায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল টিম দিয়ে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই মাঠপর্যায়ের জরিপ শেষ হওয়া মাত্রই ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক, বন্যাকবলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নদীভাঙন ঠেকাতে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দ্রুত পুনর্বাসন কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের আমন আবাদ ও পুনর্বাসনে সরকারি বীজ ও সার দিয়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।”

চাকতিয়া ও আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ পরিদর্শন

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চকরিয়ার ছড়াকুল এলাকা, চকরিয়া পৌরসভার কোচপাড়া, লক্ষ্যারচর, কাকারা, মানিকপুর এবং কৈয়ারবিল এলাকায় ঢলের পানিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ, যাতায়াতের সড়ক ও ভেঙে যাওয়া বসতবাড়ি সশরীরে পরিদর্শন করেন।

এ সময় তিনি নিজে পানিতে নেমে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের সাথে বুকে বুক মিলিয়ে কথা বলেন এবং তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা শোনেন। একই সাথে বাঁধ ও সড়ক মেরামত কাজ অতি দ্রুততার সাথে শেষ করতে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরকে কড়া তাগিদ দেন।

ইউএনকপস সম্মেলন ও মন্ত্রীর সফর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর পুলিশপ্রধানদের বহুল প্রতীক্ষিত পঞ্চম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে (UNCOPS 2026) বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিতে গত ৪ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। সফর শেষে গত ১২ জুলাই সকালে তিনি ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।

মন্ত্রী যখন এই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সফরে দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জনগণের এই কঠিন মানবিক সংকটের সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।

গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় আয়োজিত এক বিশাল জনাকীর্ণ পথসভায় এনসিপির এই প্রভাবশালী তরুণ নেতা অভিযোগ করে বলেছিলেন:

“চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বন্যাকবলিত দুর্গম অঞ্চলগুলোতে এখনো পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরকারি সাহায্য পৌঁছায়নি। বন্যার পানিতে মানুষ দিশেহারা হয়ে কষ্ট করছে, আর আমাদের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় টাকায় বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে ব্যস্ত রয়েছেন।”

আজ চকরিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই সমালোচনার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ত্রাণ বিতরণ ও পরিদর্শনকালে মন্ত্রীর সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বিজিবির আঞ্চলিক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকসার আহমদসহ স্থানীয় জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top