১৪০০ বৈদ্যুতিক বাস ও মনোরেল চালুর মেগা পরিকল্পনা সরকারের
 

 

গণপরিবহনে আমূল পরিবর্তন: ১৪০০ বৈদ্যুতিক বাস ও মনোরেল চালুর মেগা পরিকল্পনা সরকারের

দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি সর্বাধুনিক বৈদ্যুতিক (ইভি) বাস চালুর এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই রূপান্তরকে সফল করতে দেশজুড়ে সার্বজনীন ইভি চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং মেট্রোরেলের বিকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু রুটে নতুন ‘মনোরেল’ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আজ শনিবার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক সরকারের এই যুগান্তকারী ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরশীলতা কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরো পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও কার্যকর করে তুলতেই এই মেগা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে।

তিনটি বৃহৎ প্রকল্পের অধীনে আসছে ইভি বাস

সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানান, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক বাস বহর গড়ে তুলতে সরকার একাধিক আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার সহায়তায় পৃথক তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে:

১. ৫০০টি ইভি বাস: ৫০০টি বৈদ্যুতিক বাস ক্রয়ের একটি বৃহৎ প্রস্তাব বর্তমানে অর্থায়নের জন্য চূড়ান্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

২. ৩০০টি ইভি বাস (দক্ষিণ কোরিয়া): দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ৩০০টি বৈদ্যুতিক বাসের একটি চলমান কর্মসূচি রয়েছে। বাসের সংখ্যা আরও বাড়াতে বর্তমানে এই প্রকল্পটি সংশোধনের (Revision) কাজ চলছে।

৩. ৪০০টি ইভি বাস (বিশ্বব্যাংক): বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার আরও একটি মেগা প্রকল্প বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে সরকার ইতোমধ্যে ৪০০ কোটি টাকা করে দুটি পৃথক বিশেষ ক্রয় প্যাকেজ যুক্ত করেছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী ২০২৭ সালের শুরুর দিকেই দেশের নির্বাচিত কিছু রুটে এর দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যাবে। সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অন্তত ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস সরাসরি রাস্তায় নামানো।

নারীদের জন্য ১০০+ বাসের বিশেষ বহর

পরিবহন খাতে নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে এই কর্মসূচির আওতায় একটি ডেডিকেটেড বিশেষ বাস বহর থাকবে। ড. জিয়াউল হক জানান, নারী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত এই বিশেষ ইভি বাস বহরে বাসের সংখ্যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১০০টিরও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।

সারাদেশে সার্বজনীন ও বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন

ইভি বাস পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের কারিগরি মানদণ্ডের ভিত্তিতে একটি সার্বজনীন চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলছে সরকার। সচিব স্পষ্ট করেন, “এই চার্জিং স্টেশনগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি সাধারণ ও অভিন্ন (Universal) চার্জিং ব্যবস্থার আওতায় বেসরকারি ইভি অপারেটররাও এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন।”

এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশন (বিআরটিসি) দেশের ৬৪টি জেলায় তাদের নিজস্ব জমিতে আধুনিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। স্টেশনগুলোর অতিরিক্ত ধারণক্ষমতা বা সক্ষমতা থাকলে তা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেসরকারি পরিবহন অপারেটরদের জন্যও উন্মুক্ত করা হবে।

বৈদ্যুতিক বাসের অভিন্ন কারিগরি মানদণ্ড, ব্যাটারি ব্যবস্থা, চার্জিং প্রযুক্তি এবং যান্ত্রিক সামঞ্জস্যতা প্রণয়নে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-এর শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে এই মানদণ্ড বাসের জন্য হলেও পরবর্তীতে তা বৈদ্যুতিক মিনিবাস ও ইভি ট্রাকের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করা হবে।

মেট্রোরেলের বিকল্প হিসেবে আসছে ‘মনোরেল’

সড়ক সচিব জানান, বৈদ্যুতিক বাসের পাশাপাশি যেসব রুটে ভৌগোলিক বা কাঠামোগত কারণে মেট্রোরেল নির্মাণ সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প নয়, সেখানে বিকল্প আধুনিক গণপরিবহন হিসেবে ‘মনোরেল’ (Monorail) চালুর সম্ভাবনা গুরুত্বের সাথে যাচাই করছে সরকার।

সম্ভাব্য মনোরেল রুট এবং এর সামগ্রিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বুয়েট (BUET)-কে। পাশাপাশি, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা শেষে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থা নিয়ে একটি সমন্বিত ও আধুনিক উপস্থাপনা (Presentation) প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি আলোচনা

ড. জিয়াউল হক স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশ এখনও বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রযুক্তি গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এ খাতে পর্যাপ্ত দেশীয় কারিগরি দক্ষতা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া ইভি বাসের প্রাথমিক আমদানি ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

তাই বেসরকারি বাস মালিকদের এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সরকার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষ শুল্ক ও কর ছাড়সহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে অনেক বেসরকারি অপারেটর বিনিয়োগের আগে বিআরটিসির প্রাথমিক বৈদ্যুতিক বাস বহরের বাস্তব কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করতে চাইছেন।

উচ্চ প্রযুক্তির ব্যয় এবং সাধারণ যাত্রীদের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়া—এই দুটির মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সরকারি ভর্তুকি ব্যবস্থা ও ভাড়ার যৌক্তিক কাঠামো নির্ধারণ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সড়ক পরিবহন বিভাগের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে সরকার ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার নিয়ন্ত্রণ এবং মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ পরিবহনের অন্যান্য বৃহত্তর সমস্যাগুলো সমাধানের কাজও সমান্তরালভাবে অব্যাহত রাখবে বলে জানান সচিব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top