দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে এবং প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বিশাল কর্মসংস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে ও মায়েদের নরমাল ডেলিভারিতে উৎসাহিত করতে সরকারি পর্যায়ে ২৫ হাজার সার্টিফাইড ধাত্রী (মিডওয়াইফ) এবং দেশজুড়ে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
শনিবার (১১ জুলাই ২০২৬) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের গৌরবময় ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারপ্রধান এই মেগা ঘোষণা দেন। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজেরই সাবেক কৃতি শিক্ষার্থী ডা. জুবাইদা রহমান।
গ্রামের মানুষকে চিকিৎসার জন্য আর ঢাকা আসতে হবে না
চিকিৎসা খাতের বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রামীণ হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন:
“আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। গ্রামীণ অঞ্চলের সাধারণ রোগীদের যেন সামান্য চিকিৎসার জন্য বা জটিল রোগের জন্য রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসতে না হয়, সেই ব্যবস্থা আমরা করছি। এরই অংশ হিসেবে দেশের উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিদ্যমান ৫১ শয্যার (Bed) হাসপাতালগুলোকে দ্রুত ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে।”
তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের নিয়মিত উন্নত সেবা প্রদান করতে হবে।
“আমার মাকে চিকিৎসকরা যে সেবা দিয়েছেন, তা বিদেশে মিলত না”
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় দেশীয় চিকিৎসকদের মেধা ও মানবিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন তাঁর সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান। আবেগঘন কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন:
“আমাদের চিকিৎসকরা আমার মাকে যে বিশ্বমানের সেবা দিয়েছেন, সেটি হয়তো অনেক টাকা খরচ করেও বিদেশে পাওয়া যেত না। দেশের কয়েকজন চিকিৎসক অত্যন্ত আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সঙ্গে আমার মায়ের চিকিৎসা করেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে আবারও বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে যখন কথা চলছিল, তখন আমি নিজে বলেছিলাম— আমাদের দেশের ডাক্তাররা মায়ের প্রতি যে হিউম্যান টেককেয়ার (মানবিক যত্ন) ও মায়া দেখাচ্ছেন, এই পরম যত্ন কিন্তু বিদেশে পাওয়া যাবে না।”
তিনি চিকিৎসকদের মানুষের পরম বন্ধু ও ভরসার প্রতীক আখ্যায়িত করে বলেন, একজন মানুষ যখন তীব্র বিপদে পড়ে ডাক্তারের কাছে যান, তখন তিনি খোদার পর চিকিৎসকের ওপরই সবচেয়ে বড় ভরসা রাখেন। তাই সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
রোগ প্রতিরোধের মেগা উদ্যোগ: ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ও স্বাস্থ্য সচেতন জাতি গঠনে নতুন দর্শন তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর (রোগ নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়)— আমরা এই নীতির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। একজন রোগী অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসার পেছনে রাষ্ট্রের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়, রাষ্ট্র যদি আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়, তবে সেই খরচ ও জনভোগান্তি অনেক কমে যায়। আমাদের সরকার এখন সেদিকেই মনোযোগ দিয়েছে।”
তারেক রহমান জানান, নিয়োগপ্রাপ্ত ১ লাখ ‘হেলথকেয়ারার’ বা স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই প্রশিক্ষিত কর্মীরা গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করবেন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ দেবেন, যাতে দেশে সামগ্রিক রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব কমে আসে।
চব্বিশের আন্দোলনে ঢামেক-এর ঐতিহাসিক অবদানকে স্মরণ
চব্বিশের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অসামান্য বীরত্বের কথা স্মরণ করে সংসদ নেতা বলেন, “চব্বিশের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অকাতরে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই গৌরবময় মেডিকেল কলেজ শুধু বিশ্বমানের ডাক্তার তৈরি করেনি, দেশের ক্রান্তিলগ্নে সমাজনেতা ও রাষ্ট্রনায়কও তৈরি করেছে। ঢাকা মেডিকেল এখন সমগ্র রাজধানীর মানুষের পরম নির্ভরতার প্রতীক।”
এর আগে, সকালে ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে প্রধানমন্ত্রী ও ডা. জুবাইদা রহমান এসে পৌঁছালে সেখানে এক আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ সময় পর দেশের এই শীর্ষ বিদ্যাপীঠে সরকারপ্রধানের আগমনকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়।







