বন্যা ও পাহাড়ধস মোকাবিলায় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন চলছে সরকারের
 

 

বন্যা ও পাহাড়ধস মোকাবিলায় সরকারের মেগা সমন্বিত উদ্যোগ: একই সাথে চলছে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন

দেশজুড়ে চলমান অতিভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ধস এবং মারাত্মক জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় একই সাথে রেসকিউ (উদ্ধার), রিলিফ (ত্রাণ) এবং রিহ্যাবিলিটেশন (পুনর্বাসন)—এই তিন ধাপে অল-আউট কাজ করে যাচ্ছে নির্বাচিত সরকার। বিশেষ করে বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলায় সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব অনুষঙ্গকে শতভাগ সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

শনিবার (১১ জুলাই ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘করবী’ হলে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের নবনিযুক্ত মুখপাত্র মাহদী আমিন।

পাঁচ জেলায় অবর্ণনীয় কষ্ট, মাঠ প্রশাসনের সাথে প্রধানমন্ত্রীর মেগা বৈঠক

সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, অতিবৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিলেও চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলা—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে এই জেলাগুলোর পরিস্থিতি নিজে এবং তাঁর বিভিন্ন টিমের মাধ্যমে মনিটরিং করছেন।

তিনি মাঠ প্রশাসনের তৎপরতা নিশ্চিতের খতিয়ান তুলে ধরে বলেন:

“প্রধানমন্ত্রী গতকালই দুর্যোগকবলিত এই পাঁচ জেলার রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থানীয় প্রশাসনের বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ডিসি, এসপি, সিভিল সার্জন এবং ফায়ার সার্ভিসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের এসি রুম ছেড়ে তৃণমূলের জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। আগামীকাল (রবিবার) তিনি দেশের সব বিভাগীয় কমিশনারদের সঙ্গে আবারও বৈঠক করে সরাসরি দিক-নির্দেশনা দেবেন।”

তিনি জানান, উপকূলবর্তী এলাকায় কোস্টগার্ড, সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি এবং অতি দুর্গম ও বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে মাঠপর্যায়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত

বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের জানমালের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের চরম ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে বড় ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র মাহদী আমিন নিশ্চিত করেন যে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন এইচএসসি ও সমমানের সকল পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সাপেক্ষে পরবর্তী পরীক্ষার সময়সূচি বোর্ড কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে জানিয়ে দেবে।

জরুরি আর্থিক অনুদান, ১ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসন প্যাকেজ

সরকার ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তাৎক্ষণিক পুনর্বাসন ও আর্থিক সুরক্ষার কাজ শুরু করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসা প্রধান অর্থনৈতিক ও সামাজিক পদক্ষেপসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  • আর্থিক অনুদান: জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ২ কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ দুর্যোগকবলিত জেলাগুলোতে দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দিয়েছেন।

  • আশ্রয়কেন্দ্র চালু: সারা দেশে উপদ্রুত এলাকায় ১ হাজারেরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র সচল করা হয়েছে। প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে বিনামূল্যে পর্যাপ্ত সুষম খাদ্য, নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

  • খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও ক্ষতিপূরণ: বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই প্রান্তিক মানুষের জন্য বিশেষ ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ চালু করা হবে। এছাড়া যেসব গৃহস্থালী বা কৃষক বন্যা ও পাহাড়ধসে তাদের আবাদি জমি, মৎস্য চাষ (পুকুর/ঘের) কিংবা গবাদি পশু হারিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ শুরু হয়েছে।

  • স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতের প্রস্তুতি: বন্যা-পরবর্তী পানিবাহিত রোগ ও ডায়রিয়ার প্রকোপ রুখতে মেডিকেল টিমগুলোকে ‘মোবিলাইজ’ করা হয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় সাপের দংশন ও অন্যান্য জরুরি ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে এলজিইডি (LGED) এবং সড়ক ও জনপথ (RHD) বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও রেলপথ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দ্রুত মেরামতের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

“দলীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে”

মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান, তাই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি তিনি তাঁর দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদেরও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে মূল দল বিএনপিসহ ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা প্রশাসনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিটি বন্যাকবলিত অঞ্চলের তৃণমূল মানুষের মাঝে দিনরাত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ ও উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী খোদ চট্টগ্রামে সশরীরে অবস্থান করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সরাসরি তদারকি করছেন।

উপদেষ্টা দেশের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে সকল রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “যখন একটি জাতির জন্য দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে, তখনই কিন্তু আসল ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়। একটি জনগণের নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমাদের সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা, আন্তরিকতা এবং গভীর মমত্ববোধ দিয়ে আমরা এই সংকট সফলভাবে কাটিয়ে উঠব, ইনশাআল্লাহ।”

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌল্লা (সুজন মাহমুদ) ও শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক এবং আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top