১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কোনো সদিচ্ছা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার বিন্দুমাত্র বাসনা তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি দাবি করেছেন, এ কারণেই ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা ক্র্যাকডাউনের ঠিক আগমুহূর্তে তাজউদ্দীন আহমেদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
শনিবার (১১ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর মহাখালীতে ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)’ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মেগা মন্তব্য করেন। ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে রাওয়া কর্তৃপক্ষ।
তাজউদ্দীন আহমেদ ও শেখ মুজিবের সেই রাতের কথোপকথন
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই উত্তাল রাতের পটভূমি তুলে ধরে বলেন:
“২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন ঢাকাসহ দেশজুড়ে আক্রমণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন তাজউদ্দীন আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে স্পষ্ট বলেছিলেন যে— পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে যাচ্ছে এবং বাংলার আপামর মানুষ এখন পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। আপনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্ববাসীর কাছে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন না এবং পাকিস্তান ভাঙার পেছনে তাঁর কোনো অবদান থাকুক, তা তিনি চান না। এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তিনি সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।”
তিনি আরও যোগ করেন, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বরোচিত ও আকস্মিক আক্রমণের মুখে যখন দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গোটা জাতি সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাসদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, যা থমকে যাওয়া পুরো জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে চূড়ান্তভাবে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। স্পিকারের ভাষায়, “এটিই হলো বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রকৃত ও অকাট্য সত্য।”
“মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া যুদ্ধ ছিল না”
ইতিহাস বিকৃতির তীব্র সমালোচনা করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের একক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের জনতার যুদ্ধ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন:
“স্বাধীনতার পর একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ইতিহাস বিকৃত করেছে। তারা শুধু ৭ মার্চের ভাষণের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতার পুরো কৃতিত্ব নিজেদের পকেটে নেওয়ার অপচেষ্টা করেছে, যা ইতিহাসের প্রতি চরম অন্যায় ও অবিচার।”
তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করে বলেন, রাজনীতিবিদরা সাধারণত অন্য কারো কৃতিত্ব স্বীকার করতে চান না। তারা অন্যের রক্ত ও ত্যাগকে নিজেদের করে নিতে চান এবং নিজেদের দলের নির্দিষ্ট নেতার বাইরে অন্য কাউকেই ইতিহাসের পাতায় স্থান বা কৃতিত্ব দিতে চান না।
পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেই ঐতিহাসিক বিদ্রোহ
মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা স্মরণ করে সংসদের স্পিকার জানান, ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রেজিমেন্টটির মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন সক্রিয় ছিল। কোনো ধরনের পূর্বপরিকল্পনা, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কিংবা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ছাড়াই পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে তারা তাৎক্ষণিকভাবে যার যার অবস্থান থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র প্রতিরোধই ছিল মূলত পরবর্তী নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি।
নিজের সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, মূলত ফুটবল খেলার প্রচণ্ড আগ্রহ থেকেই তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা ও উৎসাহেই তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার মহান ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজে আমাকে এই ঐতিহ্যবাহী রেজিমেন্টে যোগ দিতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিলেন।”
অনুষ্ঠানে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান সংগঠক মেজর আব্দুল গনি এবং ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের রেজিমেন্ট কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারের ঐতিহাসিক অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। একই সাথে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর গৌরব ও চেইন অব কমান্ড ধরে রাখতে বর্তমান যুগের সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে চিরাচরিত পেশাদার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার জোর আহ্বান জানান।







