জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কারে বাৎসরিক পরীক্ষা বদলে সেমিস্টার পদ্ধতি
 

 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মেগা সংস্কার: বর্ষভিত্তিক পরীক্ষা বদলে আসছে সেমিস্টার পদ্ধতি, বাধ্যতামূলক হচ্ছে ‘ট্রেড কোর্স’

দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বৃহৎ চালিকাশক্তি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (NU) পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও আমূল পরিবর্তনের মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রচলিত সেশনজট ও সনাতন বর্ষভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি বিলুপ্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বছরে দুটি ‘সেমিস্টার পদ্ধতি’ চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

একই সাথে শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারের আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ সিলেবাস সংশোধন, শিক্ষাক্রম পরিবর্তন, একগুচ্ছ কারিগরি ‘ট্রেড কোর্স’ চালুকরণ এবং আউটকাম-বেইসড এডুকেশন (OBE) কারিকুলাম বাস্তবায়নের মেগা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজি প্রেসের সক্ষমতার অভাব: সেমিস্টার চালুর মূল চ্যালেঞ্জ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ এই যুগান্তকারী রূপান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থীর অনার্সে ৮টি, মাস্টার্সে ৪টি এবং পাস কোর্সে ৬টি সেমিস্টার পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশ্নপত্র ছাপানোর একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বিজি প্রেস’ (বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়)।

উপাচার্য বলেন:

“শিক্ষাক্রম ও সিলেবাস পরিবর্তনের অল-আউট প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। কিন্তু সেমিস্টার পদ্ধতিতে যেতে হলে বছরে আমাদের অন্তত ২০ সেট প্রশ্ন তৈরি ও নিখুঁতভাবে ছাপাতে হবে। বিজি প্রেসের বর্তমান অবকাঠামোতে এই বিশাল ক্যাপাসিটি নেই। আর বিজি প্রেস ছাড়া অন্য বেসরকারি বা প্রাইভেট সিকিউরিটি প্রেসে প্রশ্ন ছাপানো চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দেশের ৬৪ জেলার সরকারি ট্রেজারি থেকে এই প্রশ্ন শিক্ষকরা সংগ্রহ করেন।”

সমাধানের রোডম্যাপ: এই সংকট কাটাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সরকারি বিজি প্রেসে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে আলাদা ভবন ও সেকশন করার চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। উপাচার্য স্পষ্ট করেন, অভ্যন্তরীণ টেকনিক্যাল সংকট দূর করে আগামী ২ বছরের মধ্যে দেশের সকল কলেজে সেমিস্টার পদ্ধতি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার ডেডলাইন বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আসছে একগুচ্ছ ‘ট্রেড কোর্স’: ফ্রিল্যান্সিং থেকে এসি মেরামত ও ভাষা শিক্ষা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে গ্র্যাজুয়েটদের যাতে বেকার বসে থাকতে না হয়, সে জন্য অনার্স ও পাস কোর্সের শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি ও আইসিটি (ICT) বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি একগুচ্ছ ‘ট্রেড কোর্সের ঝুলি’ (Basket of Trade Courses) উপহার দিতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মূল বিষয়ের পাশাপাশি পছন্দমতো অনূর্ধ্ব একটি ট্রেড কোর্স বাধ্যতামূলকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এই বাস্কেটে যেসব কোর্স অন্তর্ভুক্ত থাকবে:

  • ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং।

  • ডাটা সায়েন্স ও আইটি (IT) অ্যাসেম্বলিং।

  • হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ও কেয়ার-গিভার।

  • মেকানিক্যাল, ফ্রিজ-এসি মেরামতসহ ভোকেশনাল ও কারিগরি কোর্স।

  • বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা শিক্ষা: যেসব শিক্ষার্থী দুবাই, সৌদি আরব, আমেরিকা, কানাডা বা জাপানে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শেখার বিশেষ কোর্স থাকবে।

এসব কোর্সের ক্লাস ও ল্যাব সরাসরি কলেজে হবে নাকি অন্য কোনো স্বীকৃত টেকনিক্যাল ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সার্টিফিকেট মূল্যায়নের মাধ্যমে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে বর্তমানে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সাথে স্টাডি ও পর্যালোচনা চলছে।

চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন সিলেবাস, বদলাচ্ছে চেনা রূপ

বিদ্যমান ব্যাকডেটেড সিলেবাস পরিবর্তনের কাজ ইতিমধ্যে দুই ধাপে শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের কাজ দ্রুতই শেষ হবে এবং আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে বাকি অংশের কাজ সম্পন্ন করে নতুন শিক্ষাক্রমের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ করা হবে।

উপাচার্য কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় একটা নেতিবাচক ধারণা ছিল যে—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো বাংলাও জানে না, ইংরেজিও জানে না এবং কর্মমুখী কোনো দক্ষতাও নেই। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে যারা এই নতুন সিলেবাস ও কারিকুলামে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বের হবে, তারা প্রত্যেকেই এক একজন আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কর্মী হিসেবে তৈরি হবে। সেই লক্ষ্যেই পুরোনো যুগের সমাপ্তি ঘটছে।”

দিনব্যাপী কর্মশালা: ওবিই (OBE) কারিকুলাম বাস্তবায়নের ঘোষণা

শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে মডেল টিচিং পদ্ধতি তৈরির লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজীপুরস্থ সিনেট হলে ‘ডেভেলপমেন্ট অব আউটকাম-বেইসড এডুকেশন কারিকুলাম’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

সেখানে বিশ্ববাজারের আধুনিক ও কর্মনির্ভর কারিকুলাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানকে আনন্দময় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে হলে থিওরিটিক্যাল বা তাত্ত্বিক পড়াশোনার গণ্ডি থেকে বের হতে হবে। ওবিই (OBE) কারিকুলাম প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রের উপযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। আর এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে, যার জন্য তাদের আধুনিক প্রযুক্তির নিয়মিত বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top