যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি ও রাতে ইরানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের
 

 

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ‘ভেঙে পড়ার’ ঘোষণা ট্রাম্পের: আজ রাতেও কঠোর আঘাতের হুঁশিয়ারি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ ‘ভেঙে পড়েছে’ (Over)। একই সাথে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মঙ্গলবারের ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার রাতেও ইরানি লক্ষ্যবস্তুর ওপর সর্বাত্মক ও কঠোর সামরিক আঘাত হানতে পারে মার্কিন বাহিনী।

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ন্যাটো (NATO) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চরম যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করেন।

“আজ রাতেও কঠোর আঘাত করা হবে” — ট্রাম্প

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর সামরিক পদক্ষেপের আগাম বার্তা দিয়ে বলেন:

“আমি একটু আগাম সতর্ক করে বা সংকেত দিয়ে রাখছি— আজ রাতেও আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি। আমরা গত রাতেও (মঙ্গলবার) তাদের ওপর খুব বড় আঘাত করেছি, আজ রাতেও তার পুনরাবৃত্তি হবে।”

ট্রাম্প দাবি করেন, মঙ্গলবারের মার্কিন হামলায় তেহরানের পুনর্নির্মাণাধীন অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ইরানের সামরিক সক্ষমতায় ‘ব্যাপক প্রভাব’ ফেলেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ক্রমাগত হামলার জবাবেই তারা এই পাল্টা বিমান হামলা চালাচ্ছে।

বেসামরিক অবকাঠামো ও তেলসমৃদ্ধ খর্গ দ্বীপ দখলের মেগা হুমকি

ইরানকে চরম অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি করার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে এবার ইরানের সাধারণ বেসামরিক লাইফলাইন বা অবকাঠামোতেও আঘাত করবে পেন্টাগন। তিনি বলেন:

“পরিস্থিতি আরও কঠোর করা হতে পারে। যদি প্রয়োজন হয়, আমরা তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বিদ্যুৎ কারখানা এবং লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলোও সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেব। যদিও এগুলো করতে আমার ভালো লাগে না, কিন্তু তারা বাধ্য করছে। প্রয়োজনে আমরা তাদের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ‘খর্গ দ্বীপ’ (Kharg Island)-এর নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে পারি এবং সেটি ঠেকাতে তাদের কিচ্ছু করার থাকবে না।”

“লক্ষ্য একটাই— ইরানকে পরমাণুমুক্ত করা”

ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান, ইরানের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত কৌশলগত লক্ষ্য হলো দেশটিকে সম্পূর্ণ পরমাণুমুক্ত করা। তিনি ইরানের পরমাণু আলোচক দলের ওপর তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, রুদ্ধদ্বার বৈঠকগুলোতে তেহরানের প্রতিনিধিরা ক্রমাগত মিথ্যাচার করেছে।

কোনো ধরনের আলোচনা বা কূটনৈতিক চুক্তি ছাড়া কীভাবে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প তাঁর চিরচেনা ভঙ্গিতে বলেন, “আমি জানি না শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে কি না। তবে আমরা হয়তো কোনো চুক্তি ছাড়াই ইরানকে পরমাণুমুক্ত করব, কারণ জানেন কী? সেটাই সবচেয়ে সহজ পথ।”

একই সাথে তিনি ইরানের ওপর নতুন করে একতরফা ও তীব্র অর্থনৈতিক অবরোধ (Sanctions) আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই অবরোধ কেবল ইরানের ওপরই কার্যকর হবে এবং বিশ্বের বাকি দেশগুলো আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে।

“ইরানের আঙুল এখন ট্রিগারে রয়েছে” — তেহরানের কড়া জবাব

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ভয়াবহ হুমকিসমূহ এবং চুক্তি বাতিলের মৌখিক ঘোষণার পর পাল্টা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়তি এই উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ওয়াশিংটনকে দায়ী করেছেন।

আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলী আকবর ভেলায়তি তাঁর অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে এক পোস্টে লিখেছেন:

“যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক বা যুদ্ধবিরতি বাতিলের বিষয়ে ট্রাম্পের এই মৌখিক দাম্ভিকতা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে আবারও এক ভয়াবহ আগুনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা মার্কিন প্রশাসনকে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে, এই অঞ্চল কোনো পরাশক্তির রাজনৈতিক জুয়া খেলার জায়গা নয়। আমরা অতীতেও বারবার প্রমাণ করেছি যে, যেকোনো দুঃসাহসিকতার তাৎক্ষণিক ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হয়।”

ইরানের এই শীর্ষ নীতিনির্ধারক আরও যোগ করেন, “ইরানের বীর বাহিনীদের আঙুল এখন সরাসরি অস্ত্রের ট্রিগারে রয়েছে। অপমান, অবৈধ অবরোধ ও মার্কিন দুঃসাহসিকতার বিরুদ্ধে ইরান কখনো মুখ বুজে নীরব থাকবে না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top