সাম্প্রতিক সময়ে জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে তৈরি হওয়া অসন্তোষ ও ভূতুড়ে বিলের অভিযোগের সিংহভাগই ‘ভুল-বোঝাবুঝি’র কারণে হয়েছে বলে দাবি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিতরণ সংস্থাগুলোর করণিক কিছু ভুল ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ও স্ল্যাব পরিবর্তনের কারণে বিল বেশি এসেছে এবং অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে তা দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে বিদ্যুৎ বিভাগ আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, গ্রামীণ লোডশেডিং এবং মিটারের ভাড়া সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় স্পষ্ট করা হয়।
যেসব কারণে জুন মাসে বিল বেশি এসেছে
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ। তিনি জানান, যেসব বিদ্যুৎ বিলকে গণমাধ্যমে ‘ভূতুড়ে বিল’ বলা হয়েছে, সেগুলো নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়েছে। অধিকাংশ বিলে কোনো যান্ত্রিক বা রিডিংয়ের ত্রুটি পাওয়া যায়নি। বিল বাড়ার পেছনে মূল কারণগুলো হলো:
-
ব্যবহার বৃদ্ধি ও ট্যারিফ পরিবর্তন: জুন মাসের বিল বৃদ্ধির পেছনে কেবল ট্যারিফ (মূল্য) বৃদ্ধিই একমাত্র কারণ নয়, বরং গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর স্ল্যাবে (Slab) বিল গণনা হয়, যার ফলে মোট বিল তুলনামূলক অনেক বেশি দেখায়।
-
আবহাওয়া ও বিশ্বকাপ উন্মাদনা: সাম্প্রতিক সময়ে কম বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও তাপদাহ, ঈদুল আজহা, চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ এবং এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার কারণে সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। বাসাবাড়িতে এসি, ফ্যান ও রেফ্রিজারেটরের ব্যবহার এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অনেক বেশি।
-
করণিক ভুল সংশোধন: তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে মিটার রিডার বা ডাটা এন্ট্রিতে করণিক ভুল পাওয়া গেছে। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ প্রতিকার ও সংশোধন করে দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম এ প্রসঙ্গে বলেন, “চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে সারা রাত দেশজুড়ে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা থাকছে। এই জরুরি চাহিদা সামাল দিতে রাতে ‘পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্র’গুলো বেশি চালাতে হচ্ছে এবং দিনে সেগুলোকে বিশ্রাম দিতে হচ্ছে, যা দিনের বেলায় কিছুটা ঘাটতি তৈরি করেছিল। তবে এই সংকট সাময়িক, দ্রুতই কেটে যাবে। জুন থেকে কার্যকর হওয়া বাড়তি বিলের সুফল পিডিবি আগস্ট মাস থেকে পেতে শুরু করবে।”
ঢাকার বাইরে বাড়তি লোডশেডিং ও বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ
গ্রামাঞ্চলে শহরাঞ্চলের চেয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি লোডশেডিং হওয়া এবং ভৌগোলিক বৈষম্য নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত অকপটভাবে বলেন:
“স্বাধীনতার এত বছর পার হয়ে গেলেও আমরা প্রকৃত প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারিনি। বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিক কারণেই ঢাকার গুরুত্ব ও চাহিদা সবসময় বেশি থাকে। তাই নানা টেকনিক্যাল কারণে লোডশেডিংয়ের এই আঞ্চলিক বৈষম্য রাতারাতি দূর করা যাচ্ছে না। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার কোনো ধরনের বৈষম্য চায় না। এই গ্রামীণ ও নগর বৈষম্য কমিয়ে আনতে আমরা আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতির উত্তরাধিকার ও সার্বভৌম চুক্তি
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ খাতের আত্মঘাতী ও লুণ্ঠনমূলক নীতির তীব্র সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে বিদ্যুৎ খাত যে বিশাল আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যায় জর্জরিত, তা মূলত বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল ও ব্যক্তিস্বার্থসর্বস্ব নীতির কারণে হয়েছে। বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে এই ভঙ্গুর খাতটি পেয়েছে।”
ভুল নীতির একটি খতিয়ান তুলে ধরে অমিত বলেন, এ বছর দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর সাথে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ২০ শতাংশ (১,৮০০ মেগাওয়াট) রিজার্ভ ক্যাপাসিটি থাকার কথা। অথচ বিগত সরকার ১২ হাজার মেগাওয়াটের এক বিশাল অতিরিক্ত অলস সক্ষমতা তৈরি করে রেখেছে। বছরের পর বছর এই বাড়তি সক্ষমতার কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতি ও ভর্তুকির ওপর চরম চাপ তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে করা এসব চুক্তি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন:
“বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রের স্বার্থ নিশ্চিত না করেই একতরফা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) করেছে। বর্তমান সরকার এই চুক্তিগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। তবে যেহেতু এগুলো আন্তর্জাতিক সার্বভৌম চুক্তি (Sovereign Contract), তাই চাইলেই এগুলো হুট করে বাতিল করা যায় না। তবে কোম্পানিগুলোর সাথে ট্যারিফ বা মূল্য কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান সরকার পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে জ্বালানি খাতে স্বাবলম্বী হতে চায়। এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির (Renewable Energy) ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ডিজিটাল মিটারের ভাড়া ও কিস্তি সংক্রান্ত বিভ্রান্তি নিরসন
গ্রাহকদের মাঝে প্রিপেইড বা ডিজিটাল মিটারের মাসিক ভাড়া নিয়ে চলমান বিভ্রান্তি দূর করতে বিদ্যুৎ বিভাগের লিখিত বক্তব্যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। জানানো হয়, দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা গ্রাহকদের এককালীন মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে অথবা মাসিক কিস্তিতে মিটার সরবরাহ করে থাকে।
-
এককালীন পরিশোধ: যেসব গ্রাহক মিটারের পুরো মূল্য এককালীন পরিশোধ করে সংযোগ নিয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কোনো প্রকার মিটারের কিস্তি বা অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় না।
-
কিস্তিতে পরিশোধ: শুধু যেসব গ্রাহক আবেদনের সময় কিস্তিতে মিটার সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তাঁরাই নির্দিষ্ট মেয়াদে মাসিক কিস্তি পরিশোধ করছেন। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত হার হলো— সিঙ্গেল ফেজ মিটারের কিস্তি প্রতি মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের কিস্তি প্রতি মাসে ২৫০ টাকা।







