পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি
 

 

চার দশক পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদ পুনরুদ্ধার বাংলাদেশের, নতুন সভাপতি ড. খলিলুর রহমান

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মর্যাদাপূর্ণ সভাপতি (President of the United Nations General Assembly) নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি সাইপ্রাসের বহুপাক্ষিকতাবিষয়ক বিশেষ দূত ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে (আন্দ্রেজ কাকাউরিস) এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরাজিত করে আগামী এক বছরের জন্য এই বিশ্বমঞ্চের শীর্ষ পদের দায়িত্ব লাভ করেছেন।

মঙ্গলবার (২ জুন ২০২৬) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদকক্ষে আনুষ্ঠানিক নির্বাচন ও দীর্ঘ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

ভোটের বিস্তারিত সমীকরণ

জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ঐতিহাসিক এই সভাপতি নির্বাচন শুরু হয়, যা বিরতিহীনভাবে চলে রাত ৮টা পর্যন্ত। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সরাসরি গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচন করে থাকে, যেখানে প্রতিটি সদস্য দেশের একটি করে স্বাধীন ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

এবারের নির্বাচনে মোট ১৯০টি বৈধ ভোটের মধ্যে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান ৯৯টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে, তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের শক্তিশালী প্রার্থী রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসের পক্ষে ভোট পড়েছে ৯১টি। বিশ্ব সংস্থাটির সুনির্দিষ্ট কার্যবিধির ৩০ নম্বর ধারা (Rule 30) অনুসরণ করে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

চার দশক পর ইতিহাস পুনরাবৃত্তি

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক আবর্তন (Regional Rotation) নীতি অনুসারে, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদটি এবার নির্ধারিত ছিল ‘এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ’ (Asia-Pacific Group)-এর জন্য। এই গ্রুপ থেকে চূড়ান্ত পদের লড়াইয়ে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

বাংলাদেশের জন্য এই বিজয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর আগে সর্বশেষ ১৯৮৬-৮৭ সালে এই মর্যাদাপূর্ণ পদটি লাভ করেছিল বাংলাদেশ। তৎকালীন ৪১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। দীর্ঘ চার দশক (৪০ বছর) পর ড. খলিলুর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ আবারও এই বিশ্ব গৌরব পুনরুদ্ধার করল।

দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক লড়াই ও অধিবেশনের সময়সূচি

নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমানের প্রতিপক্ষ সাইপ্রাসের প্রার্থী রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে এবং জাতিসংঘের সদর দপ্তরে চার দশকেরও বেশি সময়ের সুদীর্ঘ কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন হেভিওয়েট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এমন একজন অভিজ্ঞ প্রার্থীকে হারিয়ে বাংলাদেশের জয় বৈশ্বিক কূটনীতিতে ঢাকার শক্তিশালী অবস্থানের প্রমাণ দেয়।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, এই সভাপতি পদটি প্রতি বছর পরিবর্তিত হয় এবং জাতিসংঘের পাঁচটি প্রধান আঞ্চলিক গোষ্ঠীর (আফ্রিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক, পূর্ব ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য) মধ্যে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়। আগামী ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই ৮১তম ঐতিহাসিক অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এবং ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে উচ্চ-পর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক (High-Level General Debate) অনুষ্ঠিত হবে, যা ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে পরিচালিত হবে।

পূর্ববর্তী সভাপতির উত্তরাধিকার ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ

উল্লেখ্য, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২ জুন জার্মানির প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবক সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বিশ্বরাজনীতির অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময় এক সময়ে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কার্যকালে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) ব্যর্থতা, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ এবং জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিবের আসন্ন নির্বাচনের মতো অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এজেন্ডায় ছিল। অ্যানালেনা বেয়ারবকের মেয়াদ শেষেই আগামী সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বিশ্ব সংস্থাটির এই সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সভার হাল ধরবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top