ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম)। তিনি বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর দলের এমপিদের সামাল দেওয়ার জন্য জোর অনুরোধ করব। তিনি যদি এখনই তাঁদের সামাল দিতে না পারেন, তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই বড় বিপদে পড়বেন। এমপিদের মূল কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা, স্থানীয় প্রশাসন চালানো নয়।”
সম্প্রতি গণমাধ্যম ‘পাবলিক ইনভেস্টিগেশন’-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে প্রবীণ এই রাজনীতিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে এসব কথা বলেন।
প্রশাসনের ওপর এমপিদের হস্তক্ষেপ ও চাঁদাবাজির সমালোচনা
কর্নেল অলি আহমদ দেশের মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বর্তমানে এমপিদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিসি-এসপিদের সাথে নিয়ে ঘোরা। রাজনৈতিক মিটিং বা কর্মসূচিতে ডিসি-এসপিদের সম্পৃক্ত রাখা কোনোভাবেই ঠিক না। প্রশাসনকে সব সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও এমপিদের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও দূরে রাখতে হবে। তাহলেই দেশের সাধারণ মানুষ প্রকৃত ন্যায়বিচার পাবে।”
তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কাছে একাধিক রাষ্ট্রীয় ও গোয়েন্দা সোর্স (উৎস) আছে। সেই সোর্সগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে তাঁর নিয়মিত গোপন রিপোর্ট নেওয়া উচিত যে, কোন কোন স্বশিক্ষিত এমপি এলাকায় কী ধরনের অত্যাচার ও চাঁদাবাজি করছেন। এই চাঁদাবাজ ও অত্যাচারী এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া খোদ প্রধানমন্ত্রীরই দায়িত্ব। এ ধরনের বিতর্কিত ৫-১০ জন এমপিকে ধরে জেলে দিলে বিএনপির কোনো ক্ষতি হবে না; বরং দলের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।”
১৯৯৬ সালের ‘সংসদীয় ক্যু’ ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গোপন প্রস্তাব
সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে কর্নেল অলি আহমদ একটি বিস্ফোরক ঐতিহাসিক তথ্য ফাঁস করেন। তিনি দাবি করেন, “১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের ১৪৩ জন এমপি এবং বিএনপির ৪০ জন এমপি মিলে মোট ১৮৩ জন সংসদ সদস্য সংসদে একটি অলিখিত ‘সংসদীয় ক্যু’ (Parliamentary Coup) করতে চেয়েছিল। তারা সংসদে একটি বিশেষ বিল আনার মাধ্যমে এই ক্যু-এর পরিকল্পনা করে এবং আমাকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিল।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে প্রথম দুই দিন তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু তৃতীয় দিনে আমার বিবেক জাগ্রত হয় এবং আমি আর রাজি হইনি। সেই দিন আমি স্পষ্ট বলেছিলাম—এমন জঘন্য বেইমানি ও মুনাফেকি আমি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কোনোভাবেই করতে পারব না।” উল্লেখ্য, কর্নেল অলি আহমদ এ পর্যন্ত ৬ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন এবং ৩ বার সফলভাবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
শহীদ জিয়া আমাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলের স্মৃতি হাতড়ে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, “শহীদ জিয়াউর রহমান আমাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, নির্বাচন করে দল ক্ষমতায় আসলে আমাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানাবেন। কিন্তু সে সময় দলের ভেতরে থাকা অনেক সুযোগসন্ধানী মন্ত্রী তাঁর কান ভারী করেছিলেন এবং আমার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করেছিলেন। যার কারণে শেষ পর্যন্ত আর আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া হয়ে ওঠেনি।”
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে তিনি দেশের টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার পর গঠিত নির্বাচিত সরকারকে আরও কঠোর ও দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন।







