ইরানের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারে ট্রাম্পের ৪ কঠিন শর্ত, চুক্তি এখনো দুরে
 

 

নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিপরীতে ট্রাম্পের ৪ কঠিন শর্ত: সমঝোতা চুক্তি নিয়ে তেহরান-ওয়াশিংটনে ধোঁয়াশা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিরসনে ইরানের ওপর জারি করা মার্কিন কঠোর নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে তেহরানের সামনে ৪টি অত্যন্ত কঠিন ও স্পর্শকাতর শর্ত ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ সব ধরনের বাণিজ্যিক যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই শর্তগুলোর কথা জানান। অন্যদিকে, এই সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের (MoU) শর্তাবলি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে গভীর ধোঁয়াশা ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

চুক্তিতে পৌঁছাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৪ প্রধান শর্ত

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন, ইরান যদি মার্কিন নৌ-অবরোধ থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবে তাদের নিম্নলিখিত ৪টি শর্ত মেনে নিয়ে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে:

১. পারমাণবিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা: ইরানকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই শর্তে একমত হতে হবে যে তারা কখনোই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, গবেষণা বা সংগ্রহ করবে না।

২. হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক শুল্ক, ট্যাক্স বা টোল ছাড়াই উভয়মুখী বাণিজ্যিক যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে হবে।

৩. মাইন অপসারণ: হালের সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালী বা পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনী যদি কোনো সামুদ্রিক মাইন বা বিস্ফোরক স্থাপন করে থাকে, তবে ইরানকেই সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থ ও ঝুঁকিতে তা অপসারণ করতে হবে।

৪. সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস: ইরানের মাটির নিচে বা দুর্ভেদ্য ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে লুকিয়ে রাখা সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (Enriched Uranium) খুঁজে বের করে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করতে হবে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও চুক্তির খসড়া নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হুংকারের পর মার্কিন ও ইরানি কূটনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকের (MoU) খসড়া নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, গত কয়েক দিনে এই খসড়া টেক্সটে মার্কিন পক্ষ থেকে বেশ কিছু একপেশে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং এটি এখনও কোনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি।

ইরানের আধা-সরকারি ও প্রভাবশালী সংবাদসংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’ (Tasnim News Agency) তেহরানের একটি নির্ভরযোগ্য বেনামী কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যে ধরনের শর্ত ও খবর চাউর হয়েছে, তার বেশ কিছু তথ্য “ভুল, একপেশে এবং অসঙ্গতিপূর্ণ”। ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে কোনো চুক্তিতে যাবে না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে সূত্রটি।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি

এর আগে, মার্কিন প্রশাসনের কিছু উচ্চপদস্থ সূত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে জানিয়েছিল যে, দুই দেশের মধ্যে কাতারের দোহায় চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর বিষয়ে একটি প্রাথমিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এই অস্থায়ী চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ শুরু করা। তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।

পাশাপাশি, মার্কিন সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios) তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, এই সম্ভাব্য চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি “উন্মুক্ত ও বাধাহীন” করা হবে এবং এর বিপরীতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু ইরানি সূত্রটি এই ধরনের তথ্যের সত্যতা ও মার্কিন সদিচ্ছা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

দোহায় যখন দুই দেশের প্রতিনিধিরা শান্তি আলোচনার টেবিলে বসেছেন, ঠিক তখনই ট্রাম্পের এই ৪টি শর্ত এবং ইউরেনিয়াম ধ্বংসের দাবি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেওয়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top