পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ‘রিপল ইফেক্ট’: সারের চড়া দাম ও জ্বালানি সংকটে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি এসে লাগছে বিশ্বের সাধারণ মানুষের ডাইনিং টেবিলে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক সংকট নয়, বরং তা বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থা ও কৃষি খাতের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব (রিপল ইফেক্ট) ফেলছে। সম্প্রতি গালফ নিউজে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই সংকটের জেরে সারের আকাশচুম্বী দাম এবং জ্বালানি সংকট আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও রাসায়নিক পণ্যের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য। চলমান সংঘাতের কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সারের উৎপাদন খরচের ওপর, যা হু হু করে বাড়ছে। ভারতের গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত কৃষকরা সারের চড়া দাম নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

কৃষকদের দিশেহারা অবস্থা ও উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা:

ইন্টারন্যাশনাল ক্রপস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর দ্য সেমি-আরিড ট্রপিক্স (ICRISAT)-এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী কৃষকরা এখন সারের উচ্চমূল্যের কারণে তাদের চাষাবাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই কম সার লাগে এমন ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন বা চাষাবাদের জমি কমিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ভারত ও বাংলাদেশ:

নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো, যারা পটাশ এবং সারের কাঁচামালের জন্য অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এসব দেশে পটাশের প্রায় পুরোটা এবং সারের কাঁচামালের ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি উপকরণের দামে।

সংকট উত্তরণের উপায়: টেকসই কৃষির আহ্বান:

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈশ্বিক সংকট থেকে বাঁচতে হলে সনাতন কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন জরুরি। তারা আমদানিকৃত রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া, ডাল জাতীয় শস্য এবং এমন ফসল চাষের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে কম সার লাগে। সেচ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সৌর-চালিত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

পরিশেষে, পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কেবল জ্বালানি বা সার নয়, বরং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের খাবারটুকুও হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top