বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ঐতিহাসিক যাত্রাপথে জাতিসংঘ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক বার্তা এসেছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদনকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে। এর ফলে পূর্বনির্ধারিত ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়ার এক বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন ২০২৬) অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই স্বস্তিদায়ক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কেন সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিল বাংলাদেশ?
অর্থনৈতিক সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের মূলত ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে বিগত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট দেখা দেয়। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে পড়ে।
এই বাস্তবতায়, এলডিসি-পরবর্তী বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সিডিপির কাছে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়। পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নিজে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছেও এ বিষয়ে বিশেষ সহযোগিতা কামনা করে চিঠি পাঠান।
উত্তরণের সব শর্তে এগিয়ে বাংলাদেশ, তবে রয়েছে বড় ঝুঁকি
সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—দেশটি এলডিসি উত্তরণের প্রধান তিনটি সূচকেই (মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক) নির্ধারিত সীমা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অতিক্রম করেছে। কমিটির মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে যেখান থেকে নিকট বা মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি খুবই কম।
তবে অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিলেও সিডিপি কয়েকটি বড় বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে:
-
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের তীব্র অস্থিরতা।
-
আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন শুল্ক ও অশুল্ক বাধা।
-
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও তৈরি পোশাক রফতানি ও প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক যেকোনো ধাক্কার প্রভাব এখানে বেশি অনুভূত হয়।
এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশ যা হারাবে
স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেসব বিশেষ সুবিধা পায়, তা উত্তরণের পর ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে:
১. ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) বাজারে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার (GSP সুবিধা)।
২. বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) কিছু বিশেষ ও রেয়াতি সুবিধা।
৩. উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অত্যন্ত সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তি।
৪. আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কারিগরি সহায়তা।
এসব সুবিধা হারিয়ে গেলে দেশের রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। এই ধাক্কা সামলাতেই বাংলাদেশ সরকারের প্রণীত ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (STS)-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছে সিডিপি।
সংস্কার ছাড়া মিলবে না সুফল: সিডিপির কড়া সতর্কতা
সিডিপির চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশ সরকারকে পাঠানো এক বিশেষ বার্তায় জানিয়েছেন, কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি করা যুক্তিসঙ্গত। তবে একই সঙ্গে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন:
“এই অতিরিক্ত সময় পাওয়ার অর্থ কোনোভাবেই অভ্যন্তরীণ সংস্কার বিলম্বিত করা নয়। বরং এই বাড়তি সময়কে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।”
কমিটি বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্রুত ও বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে:
-
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
-
কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি ও রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা।
-
অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
-
শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা ও রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ (Diversification) নিশ্চিত করা।
অর্থনীতির জন্য চূড়ান্ত বার্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, সিডিপির এই সুপারিশ বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন বড় স্বস্তির, অন্যদিকে একটি বড় সতর্কবার্তাও। আগামী তিন বছর (২০২৬ থেকে ২০২৯) হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যে যদি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর, রাজস্ব ঘাটতি সংশোধন এবং বেসরকারি খাতের সক্ষমতা উন্নয়ন করা না যায়, তবে উন্নয়নশীল দেশের যুগে প্রবেশ করেও প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
উত্তরণ প্রক্রিয়া সফল করতে সিডিপি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে, যেন বাংলাদেশকে সহজ শর্তে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা, কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধি এবং এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গ্লোবাল পার্টনাররা সহযোগিতা প্রদান করে।







