ইরান চুক্তিতে ট্রাম্পের তাড়া নেই বনাম বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ ইরানের
 

 

চুক্তিতে ট্রাম্পের তাড়া নেই অন্যদিকে ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার’ তীব্র অভিযোগ ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো করতে চান না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তবে ওয়াশিংটনের এই মন্থর ও শর্তযুক্ত নীতিকে ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ বা কূটনীতির সাথে প্রতারণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শীর্ষ উপদেষ্টা মার্কিন প্রেসিডেন্টের আলোচনার সদিচ্ছা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো এই গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।

একদিকে মার্কিন প্রশাসনের কৌশলগত ধৈর্য এবং অন্যদিকে ইরানের কঠোর ও অনমনীয় অবস্থানের কারণে পারস্য উপসাগরীয় এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

‘নিখুঁত চুক্তি’ ছাড়া সই করবেন না ট্রাম্প: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

পেন্টাগনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, “ইরান সংক্রান্ত যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি কেবল তখনই একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন, যখন এটি আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণ ‘চমৎকার ও নিখুঁত চুক্তি’ (Great Deal) হিসেবে প্রমাণিত হবে।”

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে জানিয়েছিলেন যে তিনি ইরান চুক্তির বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ও বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের সেই হুংকারের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ওয়াশিংটন মূলত ৪টি কঠিন শর্ত (ইউরেনিয়াম ধ্বংস ও হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণসহ) দিয়ে ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।

এদিকে, এই সংবাদ সম্মেলনেই তাইওয়ানের কাছে মার্কিন উন্নত অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান সরবরাহের বর্তমান স্থিতি নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কৌশলগতভাবে তা এড়িয়ে যান। অস্ত্র সরবরাহের অবস্থান ঠিক কী পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট জবাব দেননি।

ট্রাম্পের দাবিগুলো ‘অযৌক্তিক’, কূটনীতি নিয়ে খেলছেন: মহসেন রেজাই

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা এবং দেশটির এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য মহসেন রেজাই ট্রাম্পের কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) সাবেক এই প্রধান কমান্ডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের আলোচনার টেবিলের আসল রূপ উন্মোচন করার দাবি জানান। মহসেন রেজাই তাঁর পোস্টে লেখেন:

“ইরানি বন্দরগুলোর ওপর বেআইনি ও অমানবিক নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখা এবং একই সাথে আলোচনার টেবিলে একের পর এক অতিরিক্ত ও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক দাবি চাপিয়ে দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করেছেন যে, তিনি আসলে কোনো অর্থপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে নন। এর পেছনে তাঁর অন্য কোনো অশুভ উদ্দেশ্য রয়েছে।”

৩য় বারের মতো প্রতারণার অভিযোগ

ইরানের এই শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্পের বর্তমান দ্বিমুখী আচরণ ও কৌশল স্পষ্ট বার্তা দেয় যে তিনি আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। আলোচনার নাটক করে মূলত তিনি বিশ্ববাসীর সামনে কূটনীতিকে অবজ্ঞা ও কালক্ষেপণ করছেন। এর মাধ্যমে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৃতীয়বারের মতো ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ করলেন বলে রেজাই দাবি করেন। (উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ঐতিহাসিক জেসিপিওএ বা ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বের হয়ে গিয়ে প্রথমবার বিশ্বাসভঙ্গ করেছিলেন)।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন, পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবন এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জটিলতার মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে এই কড়া প্রতিক্রিয়া এলো। দোহায় যখন দুই দেশের প্রতিনিধিরা খসড়া চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি করছেন, তখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই প্রকাশ্য কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আরও বেশি অস্থির ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top