জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মহান স্বাধীনতা দিবসের সকালে দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সাভারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ২০০১ সালের পর এই প্রথম দলটির কোনো শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে স্মৃতিসৌধের বেদিতে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেল।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পর জামায়াতে ইসলামীর এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ এবং বিরোধী দল হিসেবে তারা এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এর আগে সর্বশেষ ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন।
মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়ে জামায়াত নেতারা স্মৃতিসৌধ পরিহার করে চললেও এবার তাদের এই উপস্থিতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি একাত্তরের দায় স্বীকারের কোনো ইঙ্গিত? তবে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ স্পষ্ট করেছেন যে, তারা অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চান না। বরং সবাইকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই তাদের বর্তমান লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে জামায়াতের নতুন সমীকরণ:
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, এটি জামায়াতের মূলধারার রাজনীতিতে ফেরার একটি সুকৌশলী প্রচেষ্টা। তিনি মনে করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে দলটি নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে কাজ করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাইলেও স্মৃতিসৌধে যাওয়ার মাধ্যমে তারা একাত্তরের বিতর্কিত অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুঁজছে।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক মহলে:
জামায়াতের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন মনে করেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থাকলে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের সম্মান জানানো প্রতিটি দলের জন্যই অনিবার্য। তবে তিনি জামায়াতের পক্ষ থেকে একাত্তর প্রশ্নে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স এই শ্রদ্ধাকে স্রেফ ‘রাষ্ট্রীয় আচার’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, জামায়াত এখনও মনস্তাত্ত্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নেয়নি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও বিষয়টিকে জামায়াতের নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন এবং অতীতের অবস্থান পরিষ্কার না করা পর্যন্ত একে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ।
উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ পাঁচ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় এবং বেশ কয়েকজন কারাগারে মারা যান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটি আবারও রাজপথে সক্রিয় হয়েছে এবং সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।







