রাবিতে ৩ শিক্ষার্থীকে মারধর রাকসু ও শিবির নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
 

 

রাবিতে ৩ শিক্ষার্থীকে কয়েক দফায় বেধড়ক পিটুনি: রাকসু ও শিবির নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, থমথমে ক্যাম্পাস

প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) তিন শিক্ষার্থীকে প্রক্টর দফতর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতর কয়েক দফায় বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে রাকসু ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। আহতদের উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

আজ সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দফতর, রাকসু ভবন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার (লাইব্রেরি) এলাকায় এ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও মারধরের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার সূত্রপাত: ব্যক্তিগত অভিযোগ ও প্রক্টর কার্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর দফতর সূত্রে জানা যায়, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেমের প্রস্তাব ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে একই বিভাগের মহসিন আলম নামে এক ছাত্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। গত রবিবার রাতে এ বিষয়ে মীমাংসার জন্য বৈঠকে বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান।

সেখানে মহসিনের পক্ষে অংশ নেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। ওই বৈঠকে বাকবিতণ্ডার পর আজ সোমবার দুপুরে প্রক্টর পুনরায় উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসেন।

আলোচনাকালে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) এস এম সালমান সাব্বির উপস্থিত হয়ে আনাসের মোবাইল ফোন ঘেঁটে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে ছবি পান। এরপরই তাকে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ আখ্যা দিয়ে প্রক্টর কার্যালয়ের ভেতরেই প্রথম দফায় মারধর করা হয়।

লাইব্রেরির ভেতর তাণ্ডব ও অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে হিঁচড়ে আক্রমণ

প্রক্টর কার্যালয় থেকে বের হয়ে বিকেল ৩টার দিকে আনাস ও তার সঙ্গীরা রাকসু ভবনের সামনে অবস্থান নিলে রাকসু নেতাদের সাথে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে তারা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের (লাইব্রেরি) ভেতরে আশ্রয় নেন।

শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী:

  • পাঠকক্ষে আক্রমণ: রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা, কাঠের বাটাম, আইরনের রড ও বেল্ট নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনেই লাইব্রেরির রিডিং রুমে প্রবেশ করেন। সেখানে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুলকে বেধড়ক পেটায় হামলাকারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে বড় লাঠি ও বেলচা হাতে মারধর করতে দেখা গেছে।

  • সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ: হামলা চলাকালে সাধারণ পাঠরত শিক্ষার্থীরা বাধা দিলে তাদেরকেও হুমকি ও মারধর করা হয়। লাইব্রেরিতে অধ্যয়নরত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন জানান, “হুট করে লাইব্রেরিতে ঢুকে যাকে-তাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে বেধড়ক মারা হচ্ছিল। বিচারের জন্য তো দেশে আইন আছে।”

  • অ্যাম্বুলেন্সে হামলা: গুরুতর আহত অবস্থায় মাহমুদুল হাসানকে অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়ার সময় তাকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে পুনরায় লাথি ও মারধর করা হয়। পরবর্তীতে তাদের ‘নারায়ে তাকবির’ ও ‘ছাত্রলীগের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।

পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও প্রশাসনের পদক্ষেপ

হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার জানান:

“আমরা নিয়ম অনুযায়ী প্রক্টরের মাধ্যমে ছাত্রলীগ কর্মী আনাসকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসন থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর তারা রাকসু প্রতিনিধির ওপর হামলা চালায়। দুই বছর ধরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি, সেখান থেকেই শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।”

অন্যদিকে, হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান। তবে ভিডিও ফুটেজে শিবির সমর্থিত রাকসু নেতা এবং শিবিরের বিভিন্ন পদের দায়িত্বশীল নেতাদের হামলায় সরাসরি অংশ নিতে দেখা গেছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান জানান:

“শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ আনাস ও হাসান নামে দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে। পুরো ঘটনা তদন্তে উপাচার্য মহোদয় দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করবেন।”

পরবর্তীতে ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ক্যাডারদের বিচারের দাবিতে রাত সাড়ে ৬টায় উপাচার্যের কার্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে বৈঠকে বসে রাকসু ও শিবির প্রতিনিধিরা। সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম জানান, লাইব্রেরির মতো জায়গায় এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top