টানা তিন সপ্তাহের তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক, চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে রেকর্ড ৬৮টি গুরুত্বপূর্ণ জীবনঘনিষ্ঠ সংশোধনী শেষে জাতীয় সংসদে আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মেগা জাতীয় বাজেট।
নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামীকাল বুধবার (১ জুলাই ২০২৬) থেকেই এই ঐতিহাসিক বাজেট দেশজুড়ে কার্যকর হতে যাচ্ছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ৫৫তম বাজেট এবং চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়া নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও রূপান্তরমূলক জাতীয় বাজেট।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আজকের সংসদ অধিবেশনে ‘নির্দিষ্টকরণ বিল-২০২৬’ পাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
৫৯টি মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ঝড়
আজকের অধিবেশনে মূল বাজেট পাসের আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বার্ষিক ব্যয় নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীবৃন্দ মোট ৫৯টি সুনির্দিষ্ট মঞ্জুরি দাবি (Demands for Grants) সংসদে উত্থাপন করেন। এসব দাবির বিপরীতে প্রধান বিরোধী দল ও অন্যান্য জোটের সংসদ সদস্যরা মোট ১ হাজার ৩৪২টি ছাঁটাই প্রস্তাব (Cut Motions) উত্থাপন করে সরকারের বিভিন্ন নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। তবে দীর্ঘ আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে সবকটি ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় এবং মন্ত্রীদের মঞ্জুরি দাবিগুলো অনুমোদিত হয়।
এর আগে সমাপনী বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সংসদ সদস্যদের গঠনমূলক সমালোচনা, জনগণের সেন্টিমেন্ট এবং ব্যবসায়ী মহলের সুপারিশ বিবেচনা করে আমরা বাজেটে একগুচ্ছ জনবান্ধব পরিবর্তন এনেছি। করের বোঝা চাপানো আমাদের লক্ষ্য নয়, বরং অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করাই এই বাজেটের মূল দর্শন।”
অর্থবিলের ৬৮ সংশোধনী: সাধারণ মানুষের বড় জয়
গতকাল সোমবার (২৯ জুন) পাস হওয়া অর্থবিলের মাধ্যমে কর ও শুল্কের যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, তা এই বাজেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকার ৪টি বড় বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে:
১. করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ: মধ্যবিত্তদের স্বস্তি দিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা একলাফে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা আগামী ৫ বছরে ক্রমান্বয়ে ৫ লাখ টাকায় পৌঁছাবে।
২. জমি-ফ্ল্যাট নিবন্ধনের কড়াকড়ি প্রত্যাহার: জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিতর্কিত ও জটিল রাজস্ব বিধানটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
৩. ৩টি খাতের ভ্যাট বাতিল: নতুন করে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ খাতে প্রস্তাবিত ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার পিছু হটেছে।
৪. ব্যাংক হিসাবে টিআইএন বাতিল: নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকরা হয়রানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো
-
বাজেটের মোট আকার: ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা (যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি)।
-
মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা: ৬,৯৫,০০০ কোটি টাকা।
-
এনবিআর (NBR) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব লক্ষ্য: ৬,০৪,০০০ কোটি টাকা।
-
বাজেট ঘাটতি (Deficit): ২,৪৩,০০০ কোটি টাকা (যা মোট জিডিপির মাত্র ৩.৬ শতাংশ)।
-
জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা: ৬.৫ শতাংশ।
-
মূল্যস্ফীতি (Inflation) নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য: ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।
অর্থনীতির নতুন গতিপথের প্রত্যাশা
এই মেগা বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা এবং দেশীয় মোটরগাড়ি ও চিংড়ি শিল্পে ব্যাপক শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
আজ রাতে সংসদ থেকে বের হওয়ার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশা প্রকাশ করেন, বাজেট পাসের ঠিক আগের দিন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফের ৩৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক বার্তা মিলেছে, তার সাথে ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই জনবান্ধব বাজেট যুক্ত হয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনবে এবং কর্মসংস্থানে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করবে।







