গ্রিন কার্ড নিন, নয়তো বিমানের টিকিটে নিজ দেশে ফিরুন- হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী
 

 

যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস বা অস্থায়ী মর্যাদা বাতিল: ‘গ্রিন কার্ড নিন, নয়তো বিমানের টিকিট নিয়ে নিজ দেশে ফিরুন’—হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে ‘টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস’ (TPS) বা অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদায় বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য চূড়ান্ত হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটিবিষয়ক (স্বরাষ্ট্র) মন্ত্রী মার্কওয়েন মোলেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হয় এই অভিবাসীদের দ্রুত বৈধ উপায়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি (গ্রিন কার্ড) পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে, আর তা সম্ভব না হলে তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক ও বিভক্ত রায়ের পর মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ টকশোতে অংশ নিয়ে গতকাল রোববার (২৮ জুন ২০২৬) মন্ত্রী মোলেন এই কড়া বার্তা দেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বড় জয়

গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে হাইতি ও সিরিয়ার শত শত অভিবাসীর মানবিক সুরক্ষার মর্যাদা (টিপিএস) বাতিল করার আইনি অনুমতি দেয়। এই সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এর আগে গত বছর (১২ এপ্রিল ২০২৫) আফগানিস্তান ও ক্যামেরুনের হাজার হাজার অভিবাসীরও এই বিতাড়নবিরোধী সুরক্ষা কবচ বাতিল করা হয়েছিল।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সিএনএনের মুখোমুখি হয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী মার্কওয়েন মোলেন বলেন:

“হয় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার চেষ্টা করুন এবং বৈধ স্থায়ী মর্যাদায় এখানে থাকুন, নয়তো আমরা আপনাকে নিজ দেশে ফিরে যেতে সহায়তা করব। আদালতের ব্যাখ্যা এবং এই কর্মসূচির নাম থেকেই স্পষ্ট—‘টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) কোনো স্থায়ী মর্যাদা নয়।”

টিকিটের সাথে মিলবে ২,১০০ ডলারের ‘বিদায়ী’ প্রণোদনা

অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন কোন ধরনের কৌশল বা সহায়তা দেবে—তা স্পষ্ট করে মন্ত্রী মোলেন জানান, যেসব টিপিএসধারী অভিবাসী স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরবেন, তাঁদেরকে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে বিমানের ফ্রি টিকিট দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, নিজ দেশে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য নগদ ২ হাজার ১০০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় আড়াই লাখ টাকা) এককালীন পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, মার্কিন ফেডারেল আইন অনুযায়ী—যুদ্ধ, প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা বিদেশি নাগরিকদের সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার জন্য এই টিপিএস সুবিধা দেওয়া হয়। ২০১০ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর হাইতির নাগরিকদের এবং ২০১২ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর সিরীয়দের এই সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, যা পূর্ববর্তী ডেমোক্র্যাট সরকারগুলো বারবার পুনর্নবীকরণ করেছে।

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বনাম নির্বাসন নীতি

ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর সিদ্ধান্তের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিজেই এক চরম বৈপরীত্য বা দ্বিমুখী নীতির মুখে পড়েছে। একদিকে প্রশাসন হাইতি ও সিরিয়ার টিপিএস সুবিধা বাতিল করে তাঁদের ফেরত পাঠাতে চাইছে; অন্যদিকে খোদ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বর্তমানে মার্কিন নাগরিকদের জন্য হাইতি বা সিরিয়ায় ভ্রমণের বিরুদ্ধে ‘লেভেল-৪’ (সর্বোচ্চ) সতর্কতা জারি করে রেখেছে। মার্কিন নথিতেই বলা হয়েছে, এই দুই দেশে বর্তমানে ব্যাপক সহিংসতা, অপরাধ, গ্যাং কালচার, সন্ত্রাসবাদ এবং নিয়মিত অপহরণের ঘটনা ঘটছে।

ট্রাম্পের নিজের দলেই তীব্র বিদ্রোহ: ওহাইও গভর্নরের তোপ

লাখ লাখ টিপিএসধারী অভিবাসীকে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে গণ-নির্বাসনের (Mass Deportation) যে রূপরেখা ট্রাম্প প্রশাসন তৈরি করছে, তা নিয়ে খোদ রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র বিদ্রোহ ও ফাটল দেখা দিয়েছে।

সিএনএন-এর একই অনুষ্ঠানে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের প্রভাবশালী রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইন তাঁর নিজের দলের কেন্দ্রীয় সরকারের এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করে বলেন:

“হাইতি বা সিরিয়ানদের এই মুহূর্তে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। তাছাড়া এই পরিশ্রমী ও সৎ কর্মীদের হঠাৎ অপসারণ করা হলে ওহাইওর অর্থনীতিতে ধস নামবে এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে মারাত্মক জনবল সংকট তৈরি হবে।”

গভর্নর ডিওয়াইন আরও যোগ করেন, “আমাদের ওহাইওতে অনেক ক্ষেত্রে এই হাইতিয়ান অভিবাসীরাই আলঝেইমারে আক্রান্ত আপনার বৃদ্ধ মা বা বাবার সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করছেন। তাঁরা নার্সিং হোমে থাকা আমাদের পরিবারের সদস্যদের পরম যত্নে রাখছেন। এখন যদি আমরা সস্তা রাজনীতির জন্য তাঁদের সবাইকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলি, তবে আমাদের নিজেদের স্বার্থ ও অর্থনীতির কারণেই তা সম্ভব হবে না।”

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ওহাইওর স্প্রিংফিল্ডে বসবাসরত বৈধ হাইতিয়ানদের বিরুদ্ধে একটি বর্ণবাদী মিথ্যা অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, ‘হাইতিয়ানরা স্থানীয় আমেরিকানদের পোষা কুকুর-বিড়াল ধরে খেয়ে ফেলছে’। তবে রয়টার্সের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিল্প-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দায় থাকা ওহাইওর অর্থনীতিকে এই অভিবাসী হাইতিয়ানরাই সস্তা শ্রম ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করেছেন।

আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি

সুপ্রিম কোর্ট কেবল টিপিএস বাতিলের মামলাই নয়, গত বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের (Asylum Seekers) কড়া নীতি সংক্রান্ত আরেকটি মামলাতেও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। এর আগে গত মে মাসে (২৩ মে ২০২৬) একটি রুলিংয়ে বলা হয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পেতে হলে যেকোনো অস্থায়ী ভিসাধারীকে প্রথমে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে আবেদন করতে হবে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ ও অবৈধ দুই ধরনের অভিবাসীদের জন্যই লিগ্যাল স্ট্যাটাস ধরে রাখা চরম কঠিন হয়ে পড়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top