নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল জাতীয় বাজেট চূড়ান্ত পাসের ঠিক আগের দিন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকে এক ঐতিহাসিক ও বড় ধরনের সুসংবাদ মিলেছে। তীব্র ডলার সংকট কাটিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর পর আবারও ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মর্যাদাপূর্ণ ঘরে উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (Foreign Exchange Reserve)।
সোমবার (২৯ জুন ২০২৬) দিনের শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব (গ্রস) হিসাব পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ০৫৩ বিলিয়ন ডলার (৩৭,০৫২.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আন্তর্জাতিক ‘বিপিএম-৬’ (BPM6) হিসাব পদ্ধতিতে ব্যবহারের উপযোগী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৮০ বিলিয়ন ডলারে (৩২,৪৭৯.৮৮ মিলিয়ন ডলার)।
২০২২ সালের পর এই প্রথম ৩৭ বিলিয়নের ঘর স্পর্শ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঐতিহাসিক ডেটা বা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর আগে বিগত ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বশেষ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে (৩৭.০৬ বিলিয়ন) ছিল। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র আমদানি ব্যয় পরিশোধের চাপের কারণে ঠিক পরদিনই (২১ সেপ্টেম্বর ২০২২) রিজার্ভ একলাফে ৩৬ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। এরপর থেকে ক্রমাগত লুটপাট, পাচার এবং ডলারের অন্যায্য দাম নির্ধারণের কারণে রিজার্ভের ক্ষয় হতে হতে তা একপর্যায়ে গ্রস হিসাবেও ২০ বিলিয়নের নিচে নেমে গিয়েছিল।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক পদক্ষেপের সময় থেকেই রিজার্ভ মূলত ধারাবাহিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করে। গত ২৬ জুনও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার, যা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের জোয়ার এবং বাজেট সহায়তার কল্যাণে মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানে আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ৩৭ বিলিয়নের মাইলফলক অতিক্রম করল।
ইতিহাসের আয়নায় রিজার্ভের রাজনীতি ও ভুল তথ্য
রিজার্ভের এই ঐতিহাসিক উত্থানের পর স্বাভাবিকভাবেই অতীতের রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও ভুল তথ্য বা অপপ্রচারের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।
বিগত ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এক দলীয় অনুষ্ঠানে দাবি করেছিলেন, তাদের সরকারের সময়েই রিজার্ভ ১২ গুণ বেড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যেখানে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষে রিজার্ভ ছিল সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও কম।
তবে অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তাদের নথিপত্র অনুযায়ী, সেই সময় দেশের রিজার্ভের গ্রস হিসাবটিকে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে (যেমন—ইডিএফ বা রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল ও বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল মেগা প্রজেক্টে ডলার ঋণ দিয়ে) সাজানো হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। আইএমএফ-এর চাপে পরবর্তীতে বিপিএম-৬ পদ্ধতি চালুর পর তৎকালীন সরকারের প্রকৃত রিজার্ভের আসল কঙ্কাল বা নিট রিজার্ভের চরম পতনশীল রূপটি উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল।
যে ৪ কারণে রিজার্ভে এই অবিশ্বাস্য গতি
অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ৪টি প্রধান পিলারের ওপর ভর করে রিজার্ভে এই ইতিবাচক ও শক্তিশালী ধারা তৈরি হয়েছে:
১. রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ: নতুন সরকার গঠনের পর ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে অবিশ্বাস্য জোয়ার এসেছে।
২. রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি: পোশাক খাতসহ প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতের বকেয়া ডলার দেশে আসা নিশ্চিত হয়েছে।
৩. বৈদেশিক ঋণ ও বাজেট সহায়তা: আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে বড় অংকের বাজেট সহায়তা ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে জমা হয়েছে।
৪. বাজারের স্থিতিশীলতা: ক্রলিং পেগ এবং ডলারের বাজারভিত্তিক সঠিক দাম নির্ধারণ করায় হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ: গ্রস নয়, নিট রিজার্ভই মূল চাবিকাঠি
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়নের ঘরে ফেরা নিঃসন্দেহে নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বড় আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে মনে করছেন, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ‘গ্রস’ রিজার্ভের পরিমাণ দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। আইএমএফ-এর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারের উপযোগী ‘নিট’ রিজার্ভের (যা বর্তমানে ৩২.৪৮ বিলিয়ন ডলার) অবস্থান ধরে রাখা এবং কোনো চাপ ছাড়াই আন্তর্জাতিক আমদানি ব্যয় নির্বিঘ্নে মেটানোর সক্ষমতাই আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আসল মাপকাঠি হবে।






