দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা স্মরণকালের প্রলয়ংকরী ‘যমজ ভূমিকম্পে’ (Doublet Earthquake) পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাটির নিচে চাপা পড়ে বা নিখোঁজ হওয়া মানুষের সংখ্যা একলাফে ৫০ হাজার পার হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকাদের জীবিত উদ্ধারের আশা সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে আসায় রাজধানী কারাকাসসহ দুর্গত এলাকার হাসপাতাল ও মর্গে স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯২০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৬০ জনে। তবে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা এবং ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) আশঙ্কা করছে, নিখোঁজের বিশাল সংখ্যার কারণে চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়।
৪.৯ মাত্রার আফটারশকে নতুন আতঙ্ক ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি
বুধবারের মেগা ভূমিকম্পের পর শুক্রবার বিকেলে ভেনেজুয়েলায় নতুন করে ৪.৯ মাত্রার একটি তীব্র ‘আফটারশক’ বা অনুকম্পন অনুভূত হয়েছে। এর ফলে কারাকাস ও পাশের মারাকাই শহরে বহুতল ভবনে থাকা মানুষের মধ্যে নতুন করে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই রাস্তায় নেমে আসেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যে। সেখানে সরকারি উদ্ধারকাজের ধীরগতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গণ-অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ক্রেন ও ভারী যন্ত্রপাতির তীব্র সংকটের কারণে স্থানীয়রা খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন। দুর্যোগের এই সুযোগ নিয়ে লা গুয়াইরার কাতিয়া লা মার এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত শপিংমল ও দোকানে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ বা সশস্ত্র বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষতি ৮০ হাজার কোটি টাকা: রদ্রিগেজ-ট্রাম্প ফোনালাপ
জাতিসংঘের প্রাথমিক অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের (Delcy Rodríguez) জন্য এটি এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর (Marco Rubio) সঙ্গে টেলিফোনে জরুরি বৈঠক ও ফোনালাপ করেছেন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল, মাঠে এল সালভাদরের ড্রোন টিম
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে এই চরম মানবিক সংকটে বড় ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর থাকা কিছু কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিলের ঘোষণা দিয়েছেন, যাতে ত্রাণ ও চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছাতে কোনো বাধা না থাকে। এছাড়া মার্কিন সরকার ১৫ কোটি ডলারের জরুরি মানবিক সহায়তা ঘোষণা করেছে এবং উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ জাহাজ, অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার ও বিমান পাঠিয়েছে।
একই সাথে লাতিন আমেরিকার দেশ এল সালভাদরের ৫০ সদস্যের একটি হাই-টেক এলিট উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেছে। তারা ধ্বংসস্তূপের ভেতরে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজতে বিশেষ ড্রোন, থার্মাল বা তাপীয় স্ক্যানার এবং বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করছে।
নবম তলায় কিশোরীর বাঁচার লড়াই
আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, এখনো ধসে পড়া কয়েকটি বহুতল ভবনের ভেতর থেকে মানুষের কান্নার আওয়াজ ও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। লা গুয়াইরা শহরের হুগো শ্যাভেজ হাউজিং কমপ্লেক্সের একটি ধসে পড়া বহুতল ভবনের নবম তলায় আটকে থাকা ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরী ও তার পোষা প্রাণীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক লাইভ রেসকিউ অপারেশন চালাচ্ছেন।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার (IOM) মতে, এই প্রলয়ংকরী দুর্যোগের ফলে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত হতে পারেন।







