বিএনপি সরকারকে বেশি দিন সুযোগ দেওয়া হবে না- জামায়াত আমির
 

 

বিএনপি সরকারকে বেশি দিন সুযোগ দেওয়া হবে না, সময় ফুরিয়ে আসছে: চট্টগ্রামে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান

বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনদাবি পূরণে আর বেশি দিন সুযোগ দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনাদের সময় খুব সীমিত এবং তা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে যদি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ও সংস্কার না হয়, তবে এর চরম পরিণতির জন্য আপনাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।”

শনিবার (১৩ জুন ২০২৬) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে ১১-দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং লাগামহীন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে এই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

ভালোয় ভালোয় মেনে নিন, জনগণকে রাজপথে ঠেলে দেবেন না

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, সরকারকে অবিলম্বে গণভোটের মাধ্যমে উঠে আসা জনগণের রায় মেনে নিতে হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন:

“সরকার যদি বর্তমান গণভোটের রায় বা জনদাবি স্বেচ্ছায় ও শান্তিস্বভাব মেনে না নেয়, তবে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতির তৈরি হবে। ১৯৯৬ সালে তারা যেভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে শেষ মুহূর্তে বাধ্য হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করিয়েছিল, এবারও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা সেটাই করতে বাধ্য হবে। তাই ভালোয় ভালোয় মেনে নিন, জনগণকে আর রাজপথে ঠেলে দেবেন না।”

নেতা-কর্মীদের ‘জেল’ বা ‘ফাঁসি’র ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে তাঁরা বারবার জীবন দিতে প্রস্তুত। জেলের তালা বা চাবিওয়ালা কোনোটিই স্থায়ী নয়, দিন পরিবর্তন হবেই।

কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘মিথ্যা ও ভুয়া’: শফিকুর রহমান

আজ কক্সবাজারের চকরিয়ায় দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “বর্তমান সরকারের আমলে দেশবাসী একজন ‘সর্ব বিষয় বিশারদ’ মন্ত্রী পেয়েছেন, যিনি একাই সব মন্ত্রণালয় চালান, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কথাও তাঁকে বলতে হয়। আমার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটু কষ্টই লাগে। তিনি বিভিন্ন জেলায় গিয়ে ভুলভাল তথ্য দিচ্ছেন। আজকে কক্সবাজারে গিয়ে তিনি দাবি করেছেন যে বিরোধী দল নাকি বাজেটে মদ ও সিগারেটের ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিবাদে মিছিল-বিক্ষোভ করেছে—যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভুয়া।”

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদ। তাঁর মুখ দিয়ে অনবরত এমন ভুল ও অসত্য তথ্য বের হওয়া জাতির জন্য লজ্জাজনক। বাজেটের গঠনমূলক সমালোচনা করা ও ভুলত্রুটি ধরে দেওয়াটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য, এতে রাগ না করে সরকারের ধৈর্য ধরা উচিত ছিল। সংসদে কথা বলার পরিবেশ না পেয়েই তাঁরা রাজপথে জনগণের সংসদ তৈরি করেছেন।

দুর্নীতি জাতীয়করণ হয়েছে ও ব্যাংক দখল চলছে: চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বাজেট ও সুশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে বিরোধী দলের বাজেট সমালোচনার কারণে মন খারাপ করেছেন; কিন্তু আমরা এই বাস্তবতাবিবর্জিত বাজেটের কেন প্রশংসা করব? এই বাজেটে দুর্নীতি, অবাধ লুটপাট এবং ব্যাংক দখল বন্ধ করার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ রাখা হয়নি। দেশের ব্যাংকগুলো আবার দখল করা শুরু হয়েছে এবং ‘ইসলামী ব্যাংক’কে পুনরায় বিতর্কিত এস আলমের হাতে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত চলছে। এস আলমের গাড়িতে চড়ে কে সংর্বধনা নিয়েছিলেন এবং কারা তাকে আড়াল থেকে প্রোটেকশন (সুরক্ষা) দিচ্ছেন, তা বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানে।”

তিনি গতকাল (শুক্রবার) চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পুলিশ কর্তৃক তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, পুলিশ, দুদক ও বিচার বিভাগের আমূল সংস্কার না হওয়ায় জনগণের ওপর আবারও পুরোনো কায়দায় জুলুম শুরু হয়েছে। সরকার স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটলে জনগণ আবারও গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেছে নেবে।

সীমান্তে গুলি দিয়ে বন্ধুত্ব হয় না

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক মুজিবুর রহমান নিহতের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, “ভারত থেকে নতুন হাইকমিশনার আসার পরপরই সীমান্তে আবারও বাংলাদেশিকে হত্যা করা হলো। আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া আর বন্দুকের গুলি দিয়ে কখনো বন্ধুত্ব হয় না। বাংলাদেশ ও ভারতের আকাশ এবং মাটি এক নয়; এর ফয়সালা ১৯৪৭ সালেই হয়ে গেছে। ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে বাংলাদেশে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি বা তাদের দোসরেরা টিকে থাকতে পারবে না।”

আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষ আজ স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারছেন না। মা-বোন ও মেয়েরা ঘর থেকে বের হতে বা স্কুল-কলেজে যেতে নিরাপদ বোধ করছে না। চোর-ডাকাত ও অপরাধীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রমুখ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top