হরমুজ প্রণালী খোলার শর্তে সমঝোতায় চুক্তিতে পৌঁছাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
 

 

হরমুজ প্রণালী খোলার শর্তে সমঝোতায় পৌঁছাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: আগামী রোববারের মধ্যেই জেনেভায় ঐতিহাসিক চুক্তি

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলা তীব্র সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ থামাতে অবশেষে এক ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে চিরবৈরী দুই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। আগামী রোববার (১৪ জুন ২০২৬)-এর মধ্যে এই বহুপ্রতিক্ষিত চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। আজ শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) একজন উচ্চপদস্থ পশ্চিমা কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। চুক্তি সম্পাদনের সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে এই মুহূর্তে সুইজারল্যান্ডের জেনেভার নাম সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত খসড়া ও ভাষা নির্ধারণের কাজ বর্তমানে দ্রুত গতিতে চলছে। তবে লেবাননে চলমান হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধকেও এই চুক্তির শর্তের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে শুরু থেকেই অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে তেহরান।

চুক্তি সই করবেন জেডি ভ্যান্স ও বাকের গালিবাফ

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, শনিবারের (১৩ জুন) মধ্যে চুক্তির সমস্ত ভাষাগত ও আইনি দিক চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে নিজ নিজ দেশের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর পূর্বনির্ধারিত বড় ধরনের নতুন বিমান হামলা বাতিল করছেন তিনি। ট্রাম্প অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের একটি বড় এবং স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি।”

হরমুজ প্রণালী খুলে দিচ্ছে তেহরান, ট্রাম্পের একমাত্র বড় অর্জন

আজ শুক্রবার রয়টার্সের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের কথায় স্পষ্ট আভাস মেলে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে তেহরান তাদের অধিকাংশ প্রধান দাবিই ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ব জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য চুক্তি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এখন পর্যন্ত একমাত্র দৃশ্যমান ও বড় অর্জন হলো হরমুজ প্রণালী সচল করা।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিল

একজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা আজ রয়টার্সকে জানান, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী ইরানের ওপর আরোপিত সমস্ত মার্কিন তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের কোটি কোটি ডলারের জব্দ করা সম্পদ অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া হবে। এছাড়া লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে ইসরায়েলি ও পশ্চিমা হামলা পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়টিও খসড়ায় রাখা হয়েছে। তবে এই প্রাথমিক চুক্তিতে ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক ইস্যুটি রাখা হচ্ছে না, তা পরবর্তী আলোচনার জন্য তোলা থাকবে।

তেহরানের মূল তিনটি দাবি (নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ মুক্তি এবং লেবাননে হামলা বন্ধ) মেনে নেওয়ার বিপরীতে ইরান ওয়াশিংটনকে ঠিক কী ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে, সে বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

এদিকে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘মেহর নিউজ’ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, চুক্তির শর্ত হিসেবে ওয়াশিংটন তেহরানকে আরও কিছু বড় বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে:

  • ইরানের চারপাশের মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলগুলো থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা।

  • গত কয়েক মাসের সংঘাতে বিধ্বস্ত ইরানি অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা। মেহরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পুনর্গঠন কাজের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোকে অন্তত ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি বিশাল তহবিল ও আর্থিক পরিকল্পনা জমা দিতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top