রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)। গত ২৭ মে হাসপাতালটিতে আকস্মিক ছয় নবজাতকের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন ২০২৬) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) মহাপরিচালকের পক্ষে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে এক চিঠির মাধ্যমে এই লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন। লাইসেন্স বাতিলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশৃঙ্খলা এড়াতে মগবাজারের হাসপাতালটিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশ ও সন্তোষজনক নয় আদ্-দ্বীনের জবাব
চিঠি সূত্রে জানা গেছে, ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর ‘দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ৭ জুন জবাব দেওয়ার কথা থাকলেও আদ্-দ্বীনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময়সীমা ৯ জুন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়:
“৯ জুন আপনার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে লিখিত জবাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা কর্তৃপক্ষের কাছে মোটেও সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মান হয়নি। এ কারণে ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশের ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো। তবে অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ থাকবে আপনার।”
ভর্তি থাকা রোগীদের কী হবে?
লাইসেন্স বাতিলের পর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন শত শত রোগীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (DGHC) অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’কে বলেন, ‘লাইসেন্সবিহীন কোনো হাসপাতালে কোনো রোগীরই চিকিৎসা নিতে যাওয়া উচিত নয়। বর্তমানে যাঁরা সেখানে ভর্তি আছেন, তাঁদের সুবিধার্থে আমরা আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি, যেন রোগীদের নিকটস্থ অন্য কোনো উপযুক্ত হাসপাতালে নিরাপদ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীদের যদি কোনো প্রশাসনিক বা চিকিৎসার সহায়তা দরকার হয়, তবে তারা সরাসরি আমাদের জানাতে পারেন।’
রোগীদের স্বার্থে কার্যক্রম চালু রাখার দাবি আদ্-দ্বীনের
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লাইসেন্স বাতিল করার পরপরই গণমাধ্যমে একটি জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে তারা আপিল প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মানবিক ও রোগীদের জীবন রক্ষার্থে হাসপাতালের নিয়মিত চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আকুল আহ্বান জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আদ্-দ্বীন জানায়:
-
বর্তমানে হাসপাতালটিতে মোট ৪১৬ জন রোগী ইনডোরে ভর্তি রয়েছেন।
-
আজ ১১ জুনও প্রায় ১ হাজার রোগীকে বহির্বিভাগে (OPD) নিয়মিত সেবা দেওয়া হয়েছে।
-
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এনআইসিইউতে (NICU) ৬০ জন নবজাতক, আইসিইউতে (ICU) ২০ জন এবং সিসিইউতে (CCU) ৪ জন মুমূর্ষু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করে, যেহেতু ৩০ দিন পর্যন্ত সরকারের কাছে আপিল করার আইনি সময় রয়েছে, তাই সরকার এই বিপুল সংখ্যক আশঙ্কাজনক রোগীর জীবনের কথা বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগে পর্যন্ত আদ্-দ্বীনকে সচল রাখার অনুমতি দেবে।
ঘটনার পটভূমি
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর থেকেই হাসপাতালটির চিকিৎসা পরিবেশ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। গত ৪ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন মন্তব্য করেছিলেন যে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মূল ভবনটি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্যই উপযুক্ত নয়। এর আগে ৩১ মে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হাসপাতালটির নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে নির্মমভাবে লাঞ্ছিত ও হামলার শিকার হন বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।







