দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ‘সনদনির্ভর’ ধারা থেকে বের করে এনে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী শিক্ষায় রূপান্তরের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমরা যদি নিজেদের এখনই প্রস্তুত করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
রোববার (৭ জুন ২০২৬) ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক জাতীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষা ধ্বংসের অতীত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসন শুধু জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি, দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেও প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল। তবে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে এবং দেশের সামনে যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা জাতিকে নতুন উদ্দীপনা জোগাচ্ছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশের ইতিহাসে প্রতিটি পর্যায়ে যাঁরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভিত্তি ও বর্তমান গুরুত্ব
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত করা এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দূরদর্শী লক্ষ্য নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেশের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ, বর্তমানে সারা দেশে এর অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি এবং সেখানে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ইতিমধ্যে ১ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বেরিয়েছেন।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ ও আধুনিক শিক্ষাক্রমের রূপরেখা
বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যাপক ব্যবহার ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মানুষের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অনেক পুরোনো পেশা বিলুপ্ত হলেও অসংখ্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আধুনিক শিক্ষাক্রমকে পূর্ণাঙ্গ করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রাযুক্তিক ও ব্যবহারিক দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন তিনি:
-
জরুরি আধুনিক দক্ষতা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা, ফরেনসিক বিজ্ঞান, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল যোগাযোগ, জ্ঞানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, উপস্থাপন দক্ষতা (Presentation Skills), নেতৃত্ব এবং আর্থিক সচেতনতা (Financial Literacy)।
-
ভবিষ্যতের বিজ্ঞান অনুষদ: জেনেটিক প্রকৌশল, জীবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, শিল্প ইন্টারনেট অব থিংস (IIoT), ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানোপ্রযুক্তি, ত্রিমাত্রিক (3D) মুদ্রণ প্রযুক্তি এবং পঞ্চম প্রজন্মের (5G) বেতার প্রযুক্তি।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব দূরীকরণে ‘শিল্প-শিক্ষাঙ্গন সংযোগ’ ও ‘সিড ফান্ডিং’
দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও একাডেমিক সনদের তুলনায় ব্যবহারিক, প্রাযুক্তিক ও কারিগরি দক্ষতার ঘাটতির কারণে বেকার থাকছেন। এই সংকট সমাধানে বর্তমান সরকার দুটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে:
১. শিল্প-শিক্ষাঙ্গন সংযোগ (Industry-Academia Linkage): উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করতে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, ইন্টার্নশিপ এবং শিক্ষানবিশ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে এই উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
২. ক্যাম্পাসভিত্তিক উদ্যোক্তা ও সিড ফান্ডিং: শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণাকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা বিশেষ উদ্ভাবনী অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
নৈতিক শিক্ষা ও তৃতীয় ভাষা শেখার তাগিদ
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নৈতিকতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শিক্ষকদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার ওপরই শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে। তাই তাঁদের সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে তরুণদের সুযোগ বাড়াতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা আয়ত্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় উন্নয়ন একটি সম্মিলিত যাত্রা। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিল্পখাত—সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যা জনসংখ্যাকে প্রকৃত জনসম্পদে রূপান্তর করে জাতীয় সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।







