কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ক্লাউড কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ৩ লাখ কোটি রুপি) এক বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলীয় ধনকুবের রবিন খুদা। রবিন খুদার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ‘এয়ারট্রাঙ্ক’ (AirTrunk) ২০৩০ সালের মধ্যে এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য হাতে নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি।
ঢাকায় শৈশব থেকে অস্ট্রেলিয়ায় সাফল্যের গল্প
রবিন খুদার জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকাতেই। তাঁর পারিবারিক ভিটা সিরাজগঞ্জ জেলার ছাতিয়ানতলী গ্রামে হলেও, বাবা এস এম ওয়াজেদ আলীর সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি ঢাকায় বড় হন। রবিন খুদা ঢাকার শেরেবাংলা নগর গভার্নমেন্ট হাই স্কুল এবং এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন।
১৯৯৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। দেশটির সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (UTS) থেকে হিসাববিজ্ঞানে (Accounting) স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক করপোরেট জগতে নিজের ক্যারিয়ারের মজবুত ভিত্তি তৈরি করেন তিনি। বর্তমানে তিনি সিডনি শহরে স্ত্রী, দুই কন্যা ও বাবা-মাকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
করপোরেট জীবন থেকে সফল উদ্যোক্তা ও শীর্ষ ধনী
পেশাগত জীবনের শুরুতে রবিন খুদা সিংটেল ও ফুজিৎসুর মতো বিশ্বখ্যাত টেলিযোগাযোগ ও ক্লাউড কম্পিউটিং প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি পাইপ নেটওয়ার্ক এবং নেক্টডিসিতে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (CFO) হিসেবে কাজ করেন।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এয়ারট্রাঙ্ক’, যা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ও দ্রুত বর্ধনশীল ডেটা সেন্টার অপারেটর হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরে আধুনিক হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে। প্রযুক্তি অবকাঠামো খাতে অভাবনীয় সাফল্যের কারণে রবিন খুদা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনীদের তালিকায় ৩৮তম অবস্থানে রয়েছেন এবং তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।
নারীদের কারিগরি শিক্ষায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের অনন্য দান
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি বড় মাপের সমাজসেবী ও দানবীর হিসেবেও নিজের মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রবিন খুদা। সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও মেধা বিকাশের লক্ষ্যে তিনি ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা) অনুদান দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অর্থ দিয়ে আগামী ২০ বছরব্যাপী একটি বিশেষ ফেলোশিপ ও বৃত্তি কর্মসূচি পরিচালিত হবে, যা তরুণীদের কারিগরি শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দেবে। সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন, এটি শুধু তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসেই নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) রাজ্যের ইতিহাসেও কোনো একক ব্যক্তির দেওয়া সর্ববৃহৎ দাতব্য অনুদান।
ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্প
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারকে কাজে লাগাতে রবিন খুদার প্রতিষ্ঠান এই কৌশলগত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মেগা প্রকল্পে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মার্কিন প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকস্টোন’ (Blackstone) আর্থিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে সহযোগিতা দিচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর গত ৫ জুন ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় এয়ারট্রাঙ্ক ভারতজুড়ে প্রায় ৫ গিগাওয়াট (GW) সক্ষমতার ডেটা সেন্টার অবকাঠামো নির্মাণ করবে, যা ভারতের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।
ঢাকায় জন্ম নেওয়া এক সাধারণ তরুণের বৈশ্বিক প্রযুক্তি অঙ্গনের এই শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছানো এবং নেতৃত্ব দেওয়া এখন শুধু প্রবাসী সাফল্যের গল্প নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশিদের মেধার এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।







