ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কিছু ব্যতিক্রমী, অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তবে একই সঙ্গে সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সরকারের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
রোববার (৭ জুন ২০২৬) রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমের ওপর তৈরি করা এক বিশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে টিআইবি।
টিআইবির দৃষ্টিতে সরকারের যত ইতিবাচক ও অভূতপূর্ব উদ্যোগ
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি উল্লেখ করে যে, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে শীর্ষ পর্যায় থেকে কিছু প্রশংসনীয় ও অভূতপূর্ব নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে, যা অতীতে সচরাচর দেখা যায়নি। টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে আসা সরকারের প্রধান ইতিবাচক দিকগুলো হলো:
-
সংসদীয় বিশেষ সুবিধা বাতিল: সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির বিশেষ সুবিধা এবং বিলাসবহুল সরকারি প্লট বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বাতিল করা।
-
ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিতকরণ: জনভোগান্তি কমাতে এবং রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ভিভিআইপি (VVIP) প্রটোকল উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা।
-
ব্যক্তিগত সফরে নিজস্ব খরচ: সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহার করলে, তার যাবতীয় ব্যয়ভার সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে পরিশোধ করার কঠোর নির্দেশনা।
-
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা: সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ।
-
পাচার করা অর্থ ফেরত: বিগত আমলগুলোতে দেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত আনার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আইনি সহযোগিতা জোরদার করা।
-
পে-স্কেল ও সংসদীয় সক্রিয়তা: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য তিন ধাপে ‘নবম জাতীয় পে-স্কেল’ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এবং ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রেকর্ডসংখ্যক প্রশ্নোত্তর পর্ব ও অর্থপূর্ণ আলোচনায় সংসদ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এখনও সংশয়: ড. ইফতেখারুজ্জামান
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারের এসব পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক বার্তা দেন। তিনি বলেন:
“সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কিছু প্রশংসনীয় ও অভূতপূর্ব নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। তবে তা থেকেই দেশে একটি নতুন ধরনের টেকসই সুশাসিত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যায় না।”
নির্বাচনি ইশতেহার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার সঙ্গে অমিল
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, প্রথম ১০০ দিনে সরকারের নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বিএনপির নিজস্ব নির্বাচনি ইশতেহার, দলটির বহুল আলোচিত ‘৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা’ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সংস্থাটি জানায়, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের কিছু কিছু পদক্ষেপ বা স্থবিরতা নতুন করে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে কেবল প্রতীকী কিছু সংস্কার বা সুবিধা বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, জুলাই বিপ্লবের মূল আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে সরকারকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।







