ঢাবি নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের
 

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা দেওয়া বক্তব্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করলেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাবি) কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া নিজের বিতর্কিত বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে এবং নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এর মাধ্যমে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে সৃষ্ট সমস্ত সামাজিক বিতর্ক, সমালোচনা ও ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

আজ শুক্রবার (২৯ মে ২০২৬) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ ও ব্যাখ্যামূলক পোস্টে প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সম্প্রতি একটি জনপ্রিয় পডকাস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাঁর করা কিছু মন্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

ভুল ব্যাখ্যা ও অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনের যুক্তি

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও বক্তব্যের ভুল উপস্থাপন প্রসঙ্গে’ শিরোনামে দেওয়া ওই ফেসবুক পোস্টে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ লেখেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ‘SameerScane’ নামের একটি পডকাস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার কিছু মন্তব্য নিয়ে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আমি মনে করি, আমার বক্তব্যের কিছু অংশ ভুলভাবে বোঝা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তার ভুল ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। তাই বিষয়টি পরিষ্কার করার প্রয়োজন অনুভব করছি।”

ববি হাজ্জাজ তাঁর পক্ষে কয়েকটি যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন:

  • ব্যক্তিগত মতামত: পডকাস্টে বলা কথাগুলো সম্পূর্ণই তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তা ও দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ; এগুলো কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বা শিক্ষানীতির প্রতিফলন নয়।

  • মূল উদ্দেশ্য: তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল সময় এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও বেশি বিশ্বমানের একটি ‘গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ (Research University) পরিণত করার ওপর জোর দেওয়া। বক্তব্যের উদ্দেশ্য কখনোই ঢাবির ঐতিহ্য, মর্যাদা বা অবদানকে খাটো করা ছিল না।

  • অনানুষ্ঠানিক পরিসর: পডকাস্টের আলোচনাটি ছিল সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত একটি আড্ডা। এটি কোনো গবেষণাভিত্তিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নীতিগত আলোচনা ছিল না। যদি এটি কোনো আনুষ্ঠানিক একাডেমিক পরিসর হতো, তবে বক্তব্যের ভাষা ও উপস্থাপনা অবশ্যই আরও কাঠামোবদ্ধ ও নির্দিষ্ট হতো।

বিগত ১৭ বছরের উচ্চশিক্ষা খাতের সমালোচনা

বক্তব্য প্রত্যাহারের পাশাপাশি দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের কাঠামোগত অবক্ষয় নিয়ে নিজের রাজনৈতিক মূল্যায়ন তুলে ধরেন জাতীয় নাগরিক পার্টির এই নেতা। তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হলো, গত ১৭ বছরে দেশের উচ্চশিক্ষা খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। গবেষণার প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, একাডেমিক উৎকর্ষের পরিবর্তে স্বৈরাচারী সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনা অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে। এমনকি শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “প্লেজারিজমের (গবেষণা চৌর্যবৃত্তি) মতো অনৈতিক একাডেমিক চর্চার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। আমি এসব নেতিবাচক প্রবণতার কঠোর সমালোচনা করি এবং বিশ্বাস করি যে এগুলোর কোনো স্থান একটি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা উচিত নয়।”

ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান

প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ জাতি গঠনে তার অসামান্য অবদানের প্রতি তাঁর মনে গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি চান, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং বিশ্বমানের গবেষণা, উদ্ভাবন ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার একটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করুক। বর্তমানে যাঁরা ঢাবির নেতৃত্বে রয়েছেন, তাঁরাও এই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

পোস্টের শেষ অংশে ববি হাজ্জাজ আবেগঘন কণ্ঠে লেখেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা এমন একটি একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে সততা, মেধা, গবেষণার মান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা সর্বোচ্চ মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তারপরও আমার আংশিক বক্তব্যটি যেহেতু কিছুটা ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছে, অনেকেই অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমার অনেক প্রিয়জন ও শুভাকাঙ্ক্ষী মর্মাহত হয়েছেন, সে জন্য আমার এই বক্তব্য আমি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছি এবং আশা করি এরপর এ বিষয়ে আর কোনো বিতর্ক থাকবে না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top